ধনী হওয়া শেখানোর লেখক নিজেই ১২০ কোটি ডলারের ঋণে জড়িত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিখ্যাত বই ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’-এর লেখক রবার্ট কিয়োসাকি তার বিস্তৃত রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত ১.২ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ঋণে জড়িয়ে পড়েছেন বলে এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আর্থিক সাফল্যের রহস্য শেখানোর মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা এই স্বনির্ভরতা বিষয়ক গুরু দীর্ঘদিন ধরে আয়-উৎপাদনকারী সম্পদ কেনার জন্য ঋণ নেয়ার কৌশলের পক্ষে কথা বলে আসছেন।
৭৯ বছর বয়সী কিয়োসাকি বারবার এই চোখ কপালে ওঠার মতো ঋণের পরিমাণের কথা বলেছেন। তার যুক্তি, আয়-উৎপাদনকারী সম্পদ কেনার জন্য ঋণ নেয়া ধনীদের ব্যবহৃত একটি কৌশল।
‘তাই, আমি ১.২ বিলিয়ন ডলার ঋণে আছি।’ ‘গেট রিচ এডুকেশন’ নামের একটি পডকাস্টে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমার মতো কাজ করা (অন্যদের) উচিত নয়, তাই না?’
তবে কিয়োসাকির সাবেক স্ত্রী ও ব্যবসায়িক অংশীদার কিম কিয়োসাকি সম্প্রতি ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’-কে বলেছেন, ১.২ বিলিয়ন ডলারের এই অঙ্কটি ব্যাপকভাবে ভুল বোঝা হয়েছে। এটি বেস্টসেলার লেখক রবার্ট কিয়োসাকির ব্যক্তিগত ঋণ নয়।
‘আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে অনেক অ্যাপার্টমেন্ট ভবন রয়েছে,’ কিম ম্যাগাজিনটিকে বলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সম্পত্তিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ইউনিট রয়েছে।
‘তাই তাই বলা যায় হ্যাঁ, আমাদের এত ঋণ রয়েছে,’ তিনি বলেন। তবে তিনি জানান, এই ঋণগুলো রিয়েল এস্টেটের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কিয়োসাকির ব্যক্তিগত অংশ খুবই সামান্য।
এই বিপুল ঋণের স্তূপ কিয়োসাকির বিনিয়োগ কৌশলের ফল। ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার সম্পত্তির মূল্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ওই বর্ধিত সম্পদের বিপরীতে আরও ঋণ নেন এবং সেই ঋণের অর্থকে করমুক্ত আয় হিসেবে বিবেচনা করেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিনি পৃথক বিনিয়োগগুলো আলাদা লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানির (LLC) অধীনে রাখেন। ফলে কোনো একটি বিনিয়োগ সমস্যায় পড়লে সেটির প্রভাব অন্য বিনিয়োগগুলোর ওপর পড়ে না।
‘সবকিছু যদি শেষ পর্যন্ত ভেস্তেও যায়, তাহলে আপনারা আমার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন,’ ম্যাগাজিনটিকে বলেন রবার্ট কিয়োসাকি। তিনি বলেন, ‘এটা ফায়ারওয়াল—ধনীরা এভাবেই খেলাটা খেলে।’
ভ্যানিটি ফেয়ার’ হিসাব করে দেখেছে, কিয়োসাকি বছরে প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার আয় করেন—তার এই দাবি সত্য হলে ঋণের মধ্যে তার ব্যক্তিগত অংশ প্রায় ৩০ মিলিয়ন থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে।
‘তিনি এমন কথা বলতে ভালোবাসেন, যা মানুষকে চমকে দেয়,’ কিম ম্যাগাজিনটিকে বলেন। তার ভাষ্য, কিয়োসাকি প্রথমে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য বিলিয়ন ডলারের অঙ্কটি ব্যবহার করেন, এরপর ব্যাখ্যা করেন ‘কেন বিনিয়োগের ঋণ ভালো।’
ডেভিড এ. পেরেজ একজন নিবন্ধিত ট্যাক্স এজেন্ট এবং ‘ট্যাক্স ম্যাভেরিক এআই’-এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন, বহুতল আবাসনভিত্তিক রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারী হিসেবে তিনিও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেন। পেরেজ কিয়োসাকির পদ্ধতিকে ‘দারুণ কৌশল’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, সম্পত্তির বিপরীতে বড় অঙ্কের ঋণ বহন করা ‘আসলে খুবই স্বাভাবিক।’
পেরেজ বলেন, কোনো সম্পত্তির ইকুইটির বিপরীতে ঋণ নিলে সাধারণত সেটি করমুক্ত ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ সম্পত্তিটি বিক্রি করা হয়নি। তবে অতিরিক্ত ঋণ নেয়ার ফলে বন্ধকের কিস্তি ও সুদের খরচ বাড়তে পারে এবং নগদ প্রবাহ কমে যেতে পারে।
অ্যারিজোনার স্কটসডেলভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘জেপিটিডি পার্টনার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা জন পুল অবশ্য আরও সতর্কতার সুরে কথা বলেছেন। ‘আমি মনে করি, ভালো ঋণ আছে, খারাপ ঋণ আছে। কিন্তু ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এমন একটি বিষয়, যেখানে আপনি ঠিক কী করছেন, সেটা আপনাকে অবশ্যই ভালোভাবে জানতে হবে।’ দ্য পোস্টকে তিনি বলেন।
‘ঋণের ওপর ভর করে বিনিয়োগের কৌশল (লিভারেজ) সম্পদের মূল্য বাড়ার সময় দারুণভাবে কাজ করে। কিন্তু সেই মূল্যবৃদ্ধি যদি অব্যাহত না থাকে, তাহলে সম্পদের মূল্য কমার সময় আর্থিকভাবে তা চেইনসোর মতো সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।’
পুল বলেন, মূল্য বেড়ে যাওয়া সম্পদের বিপরীতে ঋণ নেওয়া কিছু সীমিত পরিস্থিতিতে যৌক্তিক হতে পারে, যার মধ্যে সম্পদ উত্তরাধিকার পরিকল্পনার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাও রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই কৌশলের ওপর অনির্দিষ্টকাল নির্ভর করা উচিত নয়।
‘এটা চিরকাল চলতে পারে না। একসময় ঋণ পরিশোধের সময় আসবেই, আর সেই সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে—ঋণের পরিমাণ যত বড়ই হোক না কেন,’ পুল বলেন।
কিয়োসাকি হয়তো এটাকে ‘রিচ ড্যাড ডেট’ বলতে পারেন, কিন্তু গড়পড়তা বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে খুব দ্রুতই তা ‘পুওর ড্যাড ব্যাংকরাপ্সি’তে পরিণত হতে পারে।
‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’ থেকে আর্থিক শিক্ষা সাম্রাজ্য
‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’কে ঘিরে কিয়োসাকি একটি আর্থিক শিক্ষা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। বইটি প্রথম ১৯৯৭ সালে নিজ উদ্যোগে প্রকাশিত হয় এবং ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’-এর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এর ৪ কোটি ৪০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে।
বইটিতে কিয়োসাকি তার জৈবিক বাবা—‘পুওর ড্যাড’—এর কাছ থেকে শেখা শিক্ষার সঙ্গে তার শৈশবের সবচেয়ে কাছের বন্ধুর বাবার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা তুলনা করেছেন। ওই ব্যক্তিকেই তিনি ‘রিচ ড্যাড’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
রবার্টের জৈবিক বাবা রালফ কিয়োসাকি হাওয়াইয়ের স্টেট সুপারিনটেনডেন্ট অব এডুকেশন ছিলেন এবং ১৯৭০ সালে লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন।
পরে কিয়োসাকি তার ‘রিচ ড্যাড’ হিসেবে হাওয়াইয়ের ব্যবসায়ী রিচার্ড কিমিকে শনাক্ত করেন। কিমির মালিকানাধীন হোটেলগুলোর একটি চেইনের মধ্যে একসময় ওয়াইকিকি বিল্টমোর হোটেলও ছিল।
কিয়োসাকি রিয়েল এস্টেটের মতো নগদ অর্থ আয় করে এমন সম্পদে বিনিয়োগের পক্ষে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে কর কমিয়ে আনা এবং বিনিয়োগ কেনার জন্য নেওয়া ঋণ ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে নেওয়া ঋণের মধ্যে পার্থক্য করার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/182409