সিনেমা দেখতে নয়, ঘুমানোর জন্য হলে যাচ্ছে মানুষ!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : দুপুরের বিরতি। বাইরে কর্মব্যস্ত শহর, আর ভেতরে অন্ধকার সিনেমা হল। পর্দায় কোনো সিনেমা চলছে না, চলছে না কোনো বিজ্ঞাপনও। সারি সারি আসনে দর্শকের বদলে শুয়ে আছেন ক্লান্ত কর্মীরা।
কেউ চোখে মাস্ক দিয়ে ঘুমাচ্ছেন, কেউ কম্বল মুড়ি দিয়ে নিচ্ছেন দিনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বিশ্রাম। সিনেমা দেখার জন্য নয়, দুপুরের একটু শান্তির ঘুমের জন্যই এখন সেখানে ভিড় করছেন মানুষ।
চীনের সিয়ান শহরের একটি সিনেমা হল ফাঁকা আসনকে কাজে লাগিয়ে চালু করেছে এই অভিনব ‘ন্যাপ সার্ভিস’। চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শানসি প্রদেশের সিয়ান শহরের লুমিয়াই সিনেমায় চালু হয়েছে এই সেবা।
জানা যায়, গত বছরের এপ্রিল থেকে কর্মদিবসে দুপুরের বিরতির সময় এই ঘুম সার্ভিস দেওয়া হচ্ছে। মাসিক সদস্যপদের জন্য একক পাসের দাম ৩৯ দশমিক ৯ ইউয়ান (৭২৮ টাকা প্রায়)। দুজনের জন্য ডাবল পাসের দাম ৫৯ দশমিক ৯ ইউয়ান (১ হাজার ৯৩ টাকা প্রায়)।
এই পাস ব্যবহার করে কর্মদিবসে নির্দিষ্ট দুটি হলে দুপুরের ঘুম বা বিশ্রাম নিতে পারেন গ্রাহকেরা। দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত এ সুযোগ থাকে।
ঘুম সার্ভিসের জন্য দুটি স্ক্রিনিং হল নির্দিষ্ট করেছে কর্তৃপক্ষ। সেখানে রয়েছে মোট ৭৬টি আসন।
এসব আসন এমনভাবে তৈরি, যা পুরোপুরি হেলিয়ে সমতল করা যায়। ফলে চেয়ারে বসার বদলে চাইলে শুয়েই বিশ্রাম নেওয়া যায়।
গ্রাহকদের জন্য বিনামূল্যে কম্বল, কফি ও অন্যান্য পানীয় দেওয়া হয়।
আর ঘুমকে আরও আরামদায়ক করতে চাইলে সামান্য বাড়তি খরচে পাওয়া যায় ডিসপোজেবল ইয়ারপ্লাগ ও আই মাস্ক। প্রতিটির দাম ৫ দশমিক ৯ ইউয়ান।
ঘুমের পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য মুঠোফোন নীরব রাখতে বলা হয়। কারও ফোনে কথা বলার প্রয়োজন হলে তাকে ঘুমের এলাকা থেকে বাইরে যেতে হয়।
সিনেমা হলের এক ব্যবস্থাপক জানান, কর্মদিবসে হলের আসনগুলোতে দর্শক কম থাকে। অর্থাৎ দিনের একটি বড় সময় আসনগুলো ফাঁকাই পড়ে থাকে। সেই অব্যবহৃত জায়গাকেই কাজে লাগাতে শুরু করা হয়েছে দুপুরের ঘুমের সেবা।
এতে একদিকে কর্মীরা পাচ্ছেন বিশ্রামের জায়গা, অন্যদিকে সিনেমা হলও ফাঁকা আসন থেকে আয় করার সুযোগ পাচ্ছে।
ব্যবস্থাপকের ভাষ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ দিনই ঘুম সার্ভিসের জন্য রাখা আসনের অর্ধেকের বেশি ব্যবহার হয়।
কোন হল বেশি জনপ্রিয়
দুটি হলের মধ্যে ‘লেজার স্ক্রিনিং হল’ গ্রাহকদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। কারণ সেখানে আসনগুলো তুলনামূলক প্রশস্ত। ফলে দুপুরে কিছুক্ষণ ঘুমানোর জন্য জায়গাগুলো বেশ আরামদায়ক।
অন্য হলটির নাম ‘ম্যাসাজ সিট হল’। সেখানে রয়েছে ম্যাসাজ চেয়ার। এসব চেয়ারও পুরোপুরি হেলিয়ে সমতল করা যায়।
ঘুমের মধ্যে কেউ নাক ডাকলে কর্মীরা তাকে সাধারণত ম্যাসাজ সিট হলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ ওই হলে আসনসংখ্যা কম। ফলে সেখানে বিশ্রাম নেওয়া মানুষের সংখ্যাও তুলনামূলক কম থাকে।
কাছেই কাজ করেন ৩৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, যার পদবি গোও। চার মাস ধরে তিনি এই ঘুম সার্ভিস ব্যবহার করছেন।
গোও জানান, আগে তিনি কর্মস্থলের ডেস্কেই দুপুরে ঘুমানোর চেষ্টা করতেন। কিন্তু সেখানে ঠিকমতো বিশ্রাম নেওয়া সম্ভব হতো না। এখন প্রতিটি কর্মদিবসে বিরতির সময় তিনি সিনেমা হলে চলে আসেন।
তার কাছে লেজার হলটি অন্ধকার ও পরিষ্কার হওয়ায় ঘুমানোর জন্য বেশ উপযোগী। সেখানে আসন পুরোপুরি হেলিয়ে শুয়ে পড়া যায়। ফলে সহজেই ঘুম চলে আসে।
‘লেইং ফ্ল্যাট প্ল্যান’
এই ঘুম সার্ভিসের নাম দেওয়া হয়েছে ‘লেইং ফ্ল্যাট প্ল্যান’। চীনে তরুণদের মধ্যে ‘লেইং ফ্ল্যাট’ বা ‘শুয়ে থাকা’ ধারণাটি বেশ পরিচিত।
জীবনের প্রতিযোগিতা ও অতিরিক্ত চাপ থেকে কিছুটা দূরে থেকে তুলনামূলক সরল ও কম চাপের জীবন বেছে নেওয়ার প্রবণতাকে বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়।
সিনেমা হলের এই উদ্যোগ সেই জনপ্রিয় ধারণাকেই মজার ব্যবসায়িক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা
লুমিয়াই সিনেমার এই উদ্যোগ এরই মধ্যে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, কর্মজীবীদের জন্য এটি সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই কার্যকর উদ্যোগ।
একজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, কর্মজীবীদের সত্যিই এমন একটি জায়গা দরকার। দামও সাশ্রয়ী। দেশের অন্য শহরেও এমন সেবা চালু হওয়া উচিত।
আরেকজন লিখেছেন, এটি সৃজনশীল একটি সমাধান। এতে গ্রাহকেরাও সুবিধা পাচ্ছেন, আবার সিনেমা হলও আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।
চীনে দুপুরে কিছু সময় ঘুমানো বা বিশ্রাম নেওয়ার চল বেশ পুরোনো।
কর্মব্যস্ত দিনের মাঝখানে শরীর ও মনকে কিছুটা বিশ্রাম দিতে অনেকেই দুপুরে ঘুমানোর সুযোগ খোঁজেন।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট