প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ রংপুর চিনিকল

প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ রংপুর চিনিকল

মহিমাগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি: প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী রংপুর চিনিকলের আখের মাড়াই কার্যক্রম। এর সঙ্গেই স্থবির হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবারের জীবিকার চাকা। যন্ত্রপাতি থেমে গেলেও থেমে থাকেনি সময়ের ক্ষয়। মহিমাগঞ্জে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা বিশাল ফটক, দীর্ঘ প্রাঙ্গণ আর সারি সারি পুরোনো স্থাপনা যেন হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এই চিনিকলে ১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। বার্ষিক ১৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনক্ষম এই মিলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল কৃষি, ব্যবসা, পরিবহন ও জনজীবনের পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বলয়। গাইবান্ধার সাতটি উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী বগুড়া, রংপুর ও জয়পুরহাটের হাজার হাজার কৃষক আখ চাষ করতেন।

২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার আখ মাড়াই স্থগিত ঘোষণা করে। এর আগে ২০০৪ সালের ৩১ মার্চ এই চিনিকলে প্রথম লে-অফ বা উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের আগস্টে মিলটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল।

বর্তমানে চিনিকলের মূল প্রাঙ্গণের ৩৫ একর কারখানা এলাকা আগাছা ও জঙ্গলের দখলে চলে গেছে। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের আবাসন এলাকার সারি সারি কোয়ার্টারগুলো এখন ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা আখ পরিবহনের গাড়িগুলো মরিচায় ক্ষয়ে যাচ্ছে, আর কারখানার ভেতরে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নিঃশব্দে অকেজো হয়ে পড়ছে দিনের পর দিন।

মিল বন্ধের পর থেকেই চুক্তিভিত্তিক ও মৌসুমী শ্রমিকদের জীবনে নেমে এসেছে নির্মম বাস্তবতা। অনেকেই এখন ভ্যান চালান, দিনমজুরির কাজ করেন কিংবা কাজের সন্ধানে জেলা ছেড়েছেন। বহু পরিবারে সন্তানের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে, ঘরে নেই চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অর্থ। শ্রমিক নেতারা বলছেন, রংপুর চিনিকল বন্ধের কারণে হাজারো মানুষের স্বপ্ন ও মর্যাদার অকাল মৃত্যু ঘটেছে।

সম্প্রতি এই মিলটি চালুর বিষয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জানান, দেশের বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই প্রক্রিয়ায় আখচাষি, শ্রমিক-কর্মচারী এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক পরিচালনা এই তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। মন্ত্রী আরও জানান, দেশের বেশিরভাগ চিনিকলের বয়স ৫০ থেকে ৭০ বছর পেরিয়ে গেছে। তাই আধুনিকায়ন ও নতুন প্রযুক্তি ছাড়া কার্যকর পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়।

চিনিকলের ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহিনুল ইসলাম বলেন, “অন্যান্য অনেক চিনিকলের চেয়ে তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে এই চিনিকলটি। মাত্র ৭০-৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেই মিলটি পুরোপুরি সচল করা সম্ভব। এতে প্রায় ১ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং অর্থনৈতিক মুক্তি মিলবে ২০ হাজার মানুষের। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানাভাবে উপকৃত হবেন লাখ লাখ মানুষ।”

গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও নতুন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন জানান, মিলটি দ্বিতীয় ধাপে চালুর জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে এবং এ বিষয়ে সরকারকে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে। চিনিকলটি দ্রুত চালুর লক্ষে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/181625