‘ট্রান্সফরমার্স’ খ্যাত বিখ্যাত ভয়েস আর্টিস্ট পিটার কুলেন আর নেই

‘ট্রান্সফরমার্স’ খ্যাত বিখ্যাত ভয়েস আর্টিস্ট পিটার কুলেন আর নেই

বিনোদন ডেস্ক: বিশ্বখ্যাত ‘ট্রান্সফরমার্স’ ফ্র্যাঞ্চাইজির নির্ভীক নায়ক ‘অপ্টিমাস প্রাইম’ এবং ‘উইনি দ্য পু’-এর বিষণ্ন গাধা ‘ইওর’ চরিত্রে অসাধারণ কণ্ঠ দিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করা কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী পিটার কুলেন আর নেই। বুধবার লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাসভবনে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন কানাডায় জন্মগ্রহণকারী এই থিয়েটার-প্রশিক্ষিত প্রবীণ অভিনেতা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। 

শুক্রবার তার এজেন্সি প্রতিনিধি কেভিন মোটলি হলিউড রিপোর্টার-কে গুণী এই শিল্পীর প্রয়াণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

অভিনেতার পরিবারের পক্ষ থেকে আবেগঘন এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, প্রিয় পরিবারের সান্নিধ্যে অত্যন্ত শান্তিতে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। এ সময় বিশ্বজুড়ে থাকা তার অসংখ্য বন্ধু ও অগণিত ভক্তের ভালোবাসা তাকে ঘিরে ছিল। পরিবারের সদস্যরা বলেন, সম্প্রদায়ের সেবা করা এবং করুণা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে অন্যদের নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে আপনারা তার অসাধারণ স্মৃতিকে সম্মানিত করুন এবং সর্বদা মনে রাখুন—‘শান্ত ও নম্র হওয়ার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।’

১৯৪১ সালের ২৮ জুলাই মন্ট্রিয়েলে জন্মগ্রহণ করেন পিটার ক্ল্যাভার কুলেন। তার বাবা হেনরি ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল পেপার সেলস কোম্পানির দীর্ঘদিনের খবরের কাগজ নির্বাহী এবং মা মুরিয়েল ছিলেন আমেরিকান। শৈশবে আত্মীয়ের খামারে থাকার সময় গরু, বাছুর, মুরগি ও কুকুরের ডাক হুবহু অনুকরণ করার মাধ্যমে শব্দ নিয়ে তার জীবনের প্রথম চর্চা শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে ন্যাশনাল থিয়েটার স্কুল অব কানাডার প্রথম গ্রাজুয়েশন ক্লাসের ছাত্র হিসেবে শিক্ষা শেষ করে তিনি পরবর্তীতে শেক্সপিয়ারের নাটকে অভিনয় করেন। অভিনয়জীবনের শুরুতে তিনি সিকেজিএম রেডিওর সংবাদ পাঠ এবং মন্ট্রিয়েল টিভিতে নাটকে অভিনয় দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি হলিউডে পাড়ি জমান এবং ‘দ্য স্মাদার্স ব্রাদার্স কমেডি আওয়ার’ এবং ‘দ্য সনি অ্যান্ড শেয়ার কমেডি আওয়ার’-এ লাইভ-অ্যাকশন পরিবেশন ও ঘোষণাকারী হিসেবে কাজ করেন।

১৯৮৪ সালে হাসব্রো খেলনা লাইনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ‘ট্রান্সফরমার্স’ টিভি সিরিজে অটোবটদের ন্যায়পরায়ণ নেতা অপ্টিমাস প্রাইম চরিত্রে প্রথম কণ্ঠ দেন কুলেন। এই চরিত্রটিতে কণ্ঠ দেওয়ার জন্য তিনি তার বড় ভাই ল্যারি কুলেনের ব্যক্তিত্বকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়েছিলেন, যিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত মার্কিন মেরিন হিসেবে ভিয়েতনামে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কুলেন জানিয়েছিলেন, তার ভাই যুদ্ধ থেকে ফেরার পর অনেক শান্ত ও নায়কতুল্য হয়ে উঠেছিলেন এবং সেই স্মৃতি থেকেই অপ্টিমাস প্রাইমের কণ্ঠের জন্ম হয়। ১৯৮৬ সালের সিনেমায় অপ্টিমাস প্রাইমের মৃত্যু হলে বিশ্বজুড়ে ভক্তদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে নির্মাতারা তাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে পরিচালক মাইকেল বে ২০০৭ সালে হলিউডের বড় পর্দায় ‘ট্রান্সফরমার্স’ ফিরিয়ে আনলে কুলেন আবারও তার সেই আইকনিক অপ্টিমাস প্রাইম চরিত্রে ফিরে আসেন এবং সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ৭০৯.৭ মিলিয়ন ডলার আয় করে। এরপর ২০০৯ সালের ‘রিভেঞ্জ অব দ্য ফেলেন’, ২০১১ সালের ‘ডার্ক অব দ্য মুন’, ২০১৪ সালের ‘এজ অব এক্সটিংশন’, ২০১৭ সালের ‘দ্য লাস্ট নাইট’, ২০১৮ সালের ‘বাম্বলবি’ এবং ২০২৩ সালের ‘রাইজ অব দ্য বিস্টস’-এ তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে অপ্টিমাস প্রাইমকে কণ্ঠ দিয়ে গেছেন।

ক্যারিয়ারজুড়ে ভয়েস অ্যাক্টিংয়ের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন পিটার কুলেন। তিনি ১৯৭৬ সালের ‘কিং কং’ রিমেক চলচ্চিত্রের টাইটেল ক্যারেক্টারের গর্জন সৃষ্টি করেন এবং ১৯৮৭ সালে আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার অভিনীত ‘প্রিডেটর’ সিনেমার সেই ভয়াবহ ভিনগ্রহী দানবের মুখ থেকে আসা বিশেষ টিক-টিক শব্দের সৃষ্টি করেছিলেন। দীর্ঘ কাজের পর রক্ত বমি হওয়া সত্ত্বেও প্রযোজকদের কাছে এলিয়েনের ছবি দেখে তিনি সেই নিখুঁত শব্দ তৈরি করেছিলেন। এ ছাড়া ১৯৮২ ও ২০০৯ সালের ‘নাইট রাইডার’ সিরিজে দুর্ধর্ষ রোবট ‘কে.এ.আর.আর.’ এবং ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সালের ‘দ্য নিউ অ্যাডভেঞ্চারস অব উইনি দ্য পু’ থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি ছবিতে ধীরগতির গাধা ‘ইওর’ চরিত্রে তার কণ্ঠ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তিনি রাস্তায় ছোট শিশুদের সামনে ইওরের গলায় কথা বলে প্রায়ই আনন্দ দিতেন।

অ্যানিমেশন দুনিয়ায় কুলেন অত্যন্ত সুপরিচিত মুখ ছিলেন। ‘চিপ অ্যান্ড ডেল রেসকিউ রেঞ্জার্স’-এ পনিরপ্রেমী ইঁদুর মনটেরি জ্যাক, ‘লায়ন ভলট্রন’-এ কোরান ও রাজা আলফর, ‘সেবার রাইডার’-এ রামরড, ‘ভেহিকল ভলট্রন’-এ কমান্ডার জেমস হকিন্স এবং ‘রাইজ অব দ্য টিওনেজ মিউট্যান্ট নিনজা টারটলস’-এ কাউন্সিলর ১ চরিত্রে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। নিজের কালজয়ী কাজের জন্য তিনি ২০১৩ সালে ‘ট্রান্সফরমার্স: প্রাইম’ সিরিজের জন্য ডেটাইম এমি মনোনয়ন লাভ করেন। অভিনয়ের বাইরে তিনি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সঙ্গে ‘অপ্টিমাস প্রাইম স্পিনঅফ অ্যাওয়ার্ড’-এর কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, যা প্রতি বছর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে অধ্যয়নরত তরুণদের প্রদান করা হয়।

মৃত্যুকালে পিটার কুলেন তার সন্তান অ্যাঙ্গাস, ক্লেয়ার, পিলারের পাশাপাশি তার অপর সন্তান ও স্টান্ট কোঅর্ডিনেটর ক্লেকে রেখে গেছেন। জীবদ্দশায় নিজের কাজ এবং ট্রান্সফরমার্স ফ্র্যাঞ্চাইজির অবিশ্বাস্য ইতিহাস নিয়ে এক অনুভূতি প্রকাশ করে কুলেন বলেছিলেন যে, এত বড় একটি ঐতিহাসিক বিষয়ের অংশ হতে পেরে তিনি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ ও সম্মানিত বোধ করেন এবং জীবনে স্মরণীয় কিছু রেখে যেতে পেরে তিনি সত্যেই আনন্দিত।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/181569