ফলাফল নিয়ে হতাশা নয়, বাস্তবতা উপলব্ধি জরুরি

ফলাফল নিয়ে হতাশা নয়, বাস্তবতা উপলব্ধি জরুরি

আব্দুল্লাহ খান : এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়া নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একাংশের মধ্যে হতাশা, শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ এবং সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাৎক্ষণিক আবেগের কারণে অনেকে অনেকভাবে বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কেউ শিক্ষা ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন, করছেন, কেউ বলছেন এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর, আবার কেউ কেউ এটাকে ইচ্ছাকৃত বলে দাবি করছেন। 

কিন্তু আবেগ সরিয়ে রেখে যদি আমরা একটু গভীরভাবে ভেবে দেখি, তবে এটা স্পষ্ট হবে যে এই ফলাফল কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়, বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা এক নির্মম বাস্তবতার সঠিক প্রতিফলন মাত্র। বিগত বছরগুলোতে কি করা হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। 'গ্রেস মার্ক' বা অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে পাসের হার বাড়িয়ে রাখার যে প্রবণতা ছিল, তা আমাদের কেবল এক অলীক স্বস্তি দিয়েছিল। সেই কৃত্রিম মূল্যায়নে অর্জিত জিপিএ-৫ শিক্ষার প্রকৃত মান বাড়াতে পারেনি, বরং লাখ লাখ 'কাগজে-কলমে পাশ করা' অথচ অদক্ষ শিক্ষার্থী তৈরি করেছে। 

এবার যখন অতিরিক্ত নম্বরের প্রলেপ ছাড়া খাতা মূল্যায়ন করা হয়েছে, তখনই আসল চিত্রটি ফুটে উঠেছে। দেশের সামগ্রিক উন্নতির জন্য আমাদের দরকার দক্ষ ও সুশিক্ষিত নাগরিক, শত শত হাজার হাজার ভুয়া জিপিএ ধারী শিক্ষিত বেকার নয়। আমরা যদি সত্যকে স্বীকার করার এই সাহসটুকু দেখাতে না পারি তা এক অর্থে নেতিবাচক, কারণ সঠিক রোগ নির্ণয় না হলে কখনো নিরাময় সম্ভব নয়। এমন ফলাফলের পেছনের কারণ আমাদের ঘরে ঘরে দৃশ্যমান। আমাদের সন্তানেরা বইয়ের পাতা থেকে সরে গিয়ে মনোযোগ দিয়েছে টিকটক, বিলস, ভিডিও গেমিংয়ের মতো অনলাইন আসক্তিকর সাইটগুলোতে। একটা প্রজন্ম মাদক, কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়ার মতো নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। পড়াশোনার ন্যূনতম পরিবেশ রক্ষার চেষ্টা তাদের মাঝে নেই। এসবের ফলে ধীরে ধীরে তারা মনোযোগ ও মানসিক স্থিরতা হারিয়ে ফেলছে।

আমার মতে, এটি শুধু শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সবার জন্যই এটি একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। অভিভাবককে বলব আপনারা শুধু সন্তানদের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। সন্তানের নিয়মিত খোঁজ খবর রাখা আপনার একান্ত কর্তব্য। আমাদের অভিভাবক সমাজের একটা ধারণা এমন যে যত বেশি জিপিএ-৫ পাবে, তত ভালো শিক্ষা। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েও যদি প্রয়োজনীয় জ্ঞান, চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা কিংবা বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন না করে, তবে সেই ফলাফল তার ভবিষ্যৎকে কতটা এগিয়ে নিতে পারবে তা একটি বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু বেশি সংখ্যক পাস করা তরুণ নয়; প্রয়োজন জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন নাগরিক। এমন একটি প্রজন্য যারা বই পড়বে, প্রযুক্তি ব্যবহার করবে কিন্তু প্রযুক্তির দাস হবে না; পরীক্ষায় ভালো করবে, আবার বাস্তব জীবনেও নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ভাষাগত দক্ষতা অর্জনে নজর দেওয়া জরুরি, যেন তরুণ সমাজ দেশের বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন তরুণ তৈরি করা, যারা চাকরির জন্য শুধু অপেক্ষা করবে না, নিজেদের দক্ষতা দিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে পারবে। তাই এবারের ফলাফলকে জাতীয় হতাশার কারণ না বানিয়ে বরং একটি আয়না হিসেবে দেখা উচিত যেখানে আমাদের শিক্ষা, পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে আজকের ফলাফল আগামী দিনের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে, ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে নয়।

পরিশেষে এ কথা বলব, শুধু ফলাফল দেখে 'এই প্রজন্ম শেষ' এমন ধরনের মন্তব্য না করে কেন তারা পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সেই কারণগুলোও খুঁজে দেখা দরকার। তবে যারা এবার প্রত্যাশিত ফলাফল করতে পারেনি, তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো হতাশ না হওয়া। একটি পরীক্ষার ফলাফল একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবন নির্ধারণ করে না। কোথায় দুর্বলতা ছিল, কোন বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে এবং পরবর্তী পরবর্তী সময়ে কীভাবে তা কাটিয়ে ওঠা যায় এখন সেদিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। অভিভাবকদেরও সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে পাশে দাঁড়াতে হবে। ব্যর্থতার ভয় দেখিয়ে নয়, দায়িত্ববোধ তৈরি করে তাকে এগিয়ে নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার বদলে বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি জ্ঞানু ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা এবং বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় [email protected] ০১৩২০-৫৫২২৫০

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/181090