মানুষের ভালবাসায় প্রিয় বগুড়া, আরও সুন্দর হোক
আতাউর রহমান মিটন : বগুড়া শহরের প্রাণ 'করতোয়া নদী'। এই নদীর তীরেই গড়ে ওঠা 'উত্তরবঙ্গের রাজধানী' খ্যাত বগুড়া শহর। অথচ সেই শহরের মানুষেরাই ময়লা ফেলে, বাসার ড্রেন ও পায়খানার লাইন সরাসরি নদীতে সংযুক্ত করে দূষিত করছে নদী, দখল করছে নদীর পাড়; যেন টুটি চেপে মারতে চাইছে করতোয়াকে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই অনিয়ম থেকে প্রিয় করতোয়া নদী ও বগুড়া শহরকে বাঁচাতে উদ্যোগ নিয়েছে নবগঠিত বগুড়া সিটি কর্পোরেশন প্রশাসন।
শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন সিটি অভিভাবক এক সময়ের দুরন্ত ও নির্ভীক ছাত্রনেতা এম আর ইসলাম স্বাধীনকে। সবাই জানেন, গত ১৪ আগস্ট, শুক্রবার একটি বিশেষ ও ব্যতিক্রমী পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়েছে করতোয়া নদীর ওপর নবনির্মিত ঐতিহাসিক শাহ ফতেহ আলী সেতুর নিচে। বগুড়া সিটি কর্পোরেশন ও বিডি ক্লিন বগুড়া এই আয়োজনটি সম্পন্ন করেছে। যদিও পুরো নদীর প্রাণপ্রবাহ সচলে করণীয়সমূহের তুলনায় এই উদ্যোগ খুবই সামান্য, তথাপি এর তাৎপর্য অনেক। সিটি কর্পোরেশন শুরু করেছে, নাগরিকদের দায়িত্ব এটা এগিয়ে নেয়া। ময়লা পরিষ্কার করার চেয়ে ময়লা ফেলার অভ্যাস ত্যাগ করা। নিজেদের বাড়ির উঠোনের মতই শহরকেও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে সবাই মিলেই।
বগুড়া শহরের পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যিক ও অন্যতম যোগাযোগ স্থাপন করেছে এই শাহ ফতেহ আলী ব্রীজ। সংস্কার শেষে উদ্বোধনের পরে ব্রীজটি বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ সহজীকরণ ছাড়াও এটি অন্যতম দর্শনীয় নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। তাই এর পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষা খুবই জরুরি। কারণ, বগুড়া শহর নিয়ে আমরা গর্বিত এবং এই শহরকে আমরা এমনভাবে দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে চাই যাতে সকলেই এখানে ছুটিতে আসে, এই শহরের আতিথ্য গ্রহণ করে মুগ্ধ হয়। এই শহরের আকবরিয়া হোটেল শতাব্দির ঐতিহ্যে ভাস্বর। এশিয়া সুইটস্ তো বটেই, শহরের আরও বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের পণ্য ও সেবার সুনাম দেশব্যাপী।
বগুড়ার নানাবিধ গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জনসমাগম। মানুষ বাড়লে বাণিজ্য বাড়ে, সাথে সাথে বাড়ে আবর্জনা। আর নদী, খাল, ড্রেনগুলো ভরে যায় সেইসব আবর্জনায়। খেসারত দিতে হয় নগরবাসীকে। একটি নগরের সুস্থ ও বাসযোগ্য পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে পরিবেশ ও জলাধার সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। জলাধার ও সবুজ প্রকৃতি নগরকে অতিরিক্ত উষ্ণতা থেকে রক্ষা করে, বৃষ্টির পানি জমতে বাধা দেয় এবং বায়ু দূষণ কমায়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ কেবল জনভোগান্তিই বাড়ায় না, মানুষের শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ভঙ্গুর করে তোলে। ঘরে ঘরে প্রফুল্ল চিত্তের জায়গা দখলে নেয় দুর্বৃত্ত- খিটমিটে মেজাজ। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় 'নগর সরকার' একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি এমন একটি একক ও স্বাধীন কাঠামো যার অধীনে নগরের সম্পূর্ণ শাসন, সেবা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে। আমাদের দেশে 'সিটি কর্পোরেশন' গঠিত হলেও 'নগর সরকার' এখনও গঠিত হয়নি। যদিও এই দাবি অনেকদিনের। নগর সরকার গঠিত না হলেও বর্তমান আইন অনুযায়ী সরকারের বিভি-ন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থা যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাস, রাস্তাঘাট, পরিবেশ সুরক্ষা, পানি ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা ইত্যাদি সিটি কর্পোরেশন এর সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে বাধ্য। নগরের স্বাভাবিক চলাচল তথা ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নয়ন, শহরের পরিচ্ছন্নতা, ইত্যাদি সরাসরি সিটি কর্পোরেশন এর আওতাধীন। এর বাইরেও সিটি কর্পোরেশন ইচ্ছে করলে এলাকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে।
আমরা আশাকরি, স্বাধীন ভাইয়ের নেতৃত্বে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট থাকবেন। কী করা যায় এ বিষয়ে সিটি প্রশাসক মহোদয় ইচ্ছে করলে নাগরিক সমাজের সাথে আলোচনা করতে পারেন, সুপারিশ নিতে পারেন, সর্বোপরি তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারেন সিটি'র উন্নয়নে। আমরা শুধু চাই, স্বাধীন সত্ত্বায় সুন্দর ও নিরাপদ নাগরিক সেবা পাবার নিশ্চয়তা।
বগুড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শহর। এই জনপদের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের মানুষ। আমরা অন্য অনেক শহরের মত ক্ষমতায় থাকার সুবিধা পেতে চাই না। বরং নিজেদের আন্তরিকতা, সৃজনশীলতা ও নৈপূণ্য খাটিয়ে বগুড়া শহরকে ঈর্ষনীয় এক শহরে পরিণত করার উদ্যোগ চাই। আমাদের সিটি প্রশাসকের স্বপ্ন হোক বিশ্বের অনেক সুন্দর মহনগরীর সাথে তুলনীয় হয়ে ওঠার। সিটি প্রশাসক নিজের শহরকে সুন্দর করে তোলার জন্য আপনি পাড়ায় পাড়ায় সমাবেশ করুন, তরুণদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী ব্রিগেড গঠন করুন (যেমন- বিডি ক্লিন), শিশুদের মেধা ও মনন বিকাশে সহায়ক কর্মসূচী গ্রহণে উৎসাহ দিন।
বগুড়ার মাদক ব্যবসায়ী চক্র কারও অচেনা নয়, তাই মাদকের বিরুদ্ধে আপনি সত্যিকার ও সাহসী পদক্ষেপ নিন। বগুড়া টাউন বাস সার্ভিস চালু, করতোয়া নদীকে ঘিরে ওয়াটারওয়ে চালু'র মাধ্যমে শহরের যানজট নিরসনে পদক্ষেপ নিন। সর্বোপরি, বগুড়ার উন্নয়নে শুধু সরকারের মুখের দিকে না তাকিয়ে থেকে আপনার ভোটার, উৎসাহী বিনিয়োগকারীদের দিকে তাকান। বগুড়ার মানুষের ভালবাসায়, নিজেদের টাকায় সম্মিলিতভাবে গড়ে উঠুক আধুনিক ও অনন্য বগুড়া শহর।
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক ০১৭১১-৫২৬৯ ৭৯
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/180988