বগুড়ায় জ্বালানিবিহীন বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ
স্টাফ রিপোর্টার : জ্বালানি ব্যবহার না করেই ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফলতা এসেছে বগুড়ায়। পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রযুক্তি কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় এবার ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ মেগাওয়াটের একটি পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করছে বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ)।
গবেষক দলের তথ্য মতে, ২০১৪ সাল থেকে ধারাবাহিক গবেষণা, প্রকৌশল নকশা উন্নয়ন, বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সমন্বয় এবং পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির একটি কার্যকর প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়েছে। প্রদর্শনীতে প্রায় ১০০ কিলোওয়াট বৈদ্যুতিক ড্রাইভিং পাওয়ারের সঙ্গে ফ্লাইহুইলে আগে থেকে সঞ্চিত ঘূর্ণন শক্তি ব্যবহার করে প্রায় ৫শ’ কিলোওয়াট পর্যন্ত তাৎক্ষণিক আউটপুট সক্ষমতা প্রদর্শন করা হয়। এই শক্তি দিয়ে সাবমার্সিবল পাম্প, ওয়েল্ডিং মেশিন ও বৈদ্যুতিক মোটর চালিয়ে দেখানো হয়।
প্রযুক্তিটির মূল ভিত্তি হলো ভারী ফ্লাইহুইলে ঘূর্ণন গতিশক্তি সঞ্চয় এবং প্রয়োজনের সময় সেই শক্তিকে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তর করা। ব্যবস্থাটিতে মোটর, ভেরিয়েবল ফ্রিকোয়েন্সি ড্রাইভ (ভিএফডি), গিয়ারবক্স, ভারী ফ্লাইহুইল, শ্যাফট, বিয়ারিং এবং ১৫০ আরপিএমের স্থায়ী চুম্বক জেনারেটর ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষকদের কারিগরি পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে এক মেগাওয়াট ক্ষমতার প্ল্যান্ট স্থাপনের বিষয়টি ও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আকস্মিক উচ্চ লোড, বড় মোটর চালুর সময় বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা, ভোল্টেজ ও কম্পাঙ্কের ওঠানামা এবং স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎ ঘাটতির সময় ফ্লাইহুইলভিত্তিক ব্যবস্থা দ্রুত শক্তি সরবরাহে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা ও কৃষি সেচের মতো ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের বিদ্যুৎ সহায়তা নিশ্চিত করতে এর ব্যবহার সম্ভাবনাময়।
গবেষক দলের সদস্য ড. মনিরুল ইসলাম বলেন, দেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যয় এবং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন থেকেই ২০১৪ সালে এ গবেষণার কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ সময়ের গবেষণা ও পরীক্ষার পর প্রযুক্তিটির কার্যকর প্রোটোটাইপ তৈরি সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৫০ আরপিএমের লো-স্পিড স্থায়ী চুম্বক জেনারেটরের মাধ্যমে ফ্লাইহুইলে সঞ্চিত শক্তিকে প্রয়োজনের সময় বিদ্যুতে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পূর্ণাঙ্গ পাইলট পর্যায়ে প্রযুক্তিটির সক্ষমতা যাচাই করা। সফল হলে বিদ্যমান নকশার ভিত্তিতে একাধিক ইউনিট স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে।
আরডিএ মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. আবদুল মজিদ প্রামাণিক বলেন, দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনকে শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব প্রয়োগের আগে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা জরুরি। আরডিএ ক্যাম্পাসে পূর্ণাঙ্গ পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে এর বাস্তব কর্মক্ষমতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করা হবে।
পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, বিদ্যুৎ বিভাগ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রযুক্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
এদিকে গত রোববার দুপুরে বগুড়া সদরের এরুলিয়ার বামদিঘী এলাকায় এ পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্টটি সরজমিনে পরিদর্শন করেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা এবং আরডিএর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক। পরিদর্শনকালে ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ও মোটর চালু করে দুটি পাম্প এবং একটি ওয়েল্ডিং মেশিন চালিয়ে কার্যকারিতা প্রদর্শন করা হয়।
পরিদর্শন শেষে সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনের এ উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, দীর্ঘদিনের গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তিটি প্রোটোটাইপ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন প্রয়োজন কারিগরি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দিকগুলো দ্রুত যাচাই করে সফল হলে সরকারি উদ্যোগে এর বৃহত্তর প্রয়োগের ব্যবস্থা করা।
গবেষক দলের প্রাথমিক অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, এক মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ফ্লাইহুইল গ্রিন পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। সঞ্চিত শক্তি পুনরায় সরবরাহের কার্যকর ব্যয় ইউনিট প্রতি প্রায় ১ টাকা ৫০ পয়সা এবং সম্ভাব্য কার্যকাল প্রায় ৪০ বছর হিসেবে প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, বাংলাদেশে প্রযুক্তিটি সফলভাবে প্রয়োগ করা গেলে সৌরবিদ্যুতের উদ্বৃত্ত শক্তি সংরক্ষণ, সন্ধ্যার পিক চাহিদা সামাল দেওয়া, কৃষি সেচ, হিমাগার, হাসপাতাল, তৈরি পোশাকশিল্প, ইপিজেড এবং ভারী যন্ত্রপাতি নির্ভর শিল্পে দ্রুত বিদ্যুৎ সহায়তা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে ডিজেল জেনারেটরের ব্যবহার ও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/180365