সীতাকুণ্ডে জাহাজে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের কারণেই ৯ শ্রমিকের মৃত্যু
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের প্রাথমিক ধারণা, বিষাক্ত এই গ্যাসের কারণেই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেন এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর মাল্টি-গ্যাস ডিটেক্টর দিয়ে জাহাজের ভেতরে পরীক্ষা চালিয়ে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই গ্যাসের বিষক্রিয়াই শ্রমিকদের মৃত্যুর মূল কারণ।
এসএম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা। সমন্বিত কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাহাজ থেকে হাইড্রোজেন সালফাইড অপসারণ করা হবে।’
তিনি জানান, হাইড্রোজেন সালফাইড পানিতে দ্রবীভূত হয়। তাই সমন্বিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পানি দিয়ে জাহাজের ভেতরের অংশ ধুয়ে গ্যাস অপসারণের ব্যবস্থা করা হবে।
কীভাবে ঘটলো দুর্ঘটনা
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুরোনো একটি এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কাটার সময় জাহাজের বদ্ধ অংশে থাকা বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন শ্রমিকরা।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডে ৩৪ জন শ্রমিক ও কর্মচারী কাজ করছিলেন। একপর্যায়ে জাহাজের ভেতরে থাকা দুই শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁদের উদ্ধারে অন্য শ্রমিকেরা এগিয়ে গেলে তারাও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন। পরে একে একে ৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়। আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের দুই ভাই মনসুর আহমেদ ও নাসির উদ্দিন রয়েছেন। অন্যরা হলেন সানি দাস, পলাশ দাস, রানা মিয়া, হাবিবুর রহমান, খোকন মিয়া, আব্দুল আলিম সুজন ও ১৭ বছর বয়সী মতিউর রহমান সাজ্জাদ।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পুরোনো এলএনজি জাহাজটির ইঞ্জিন রুমের একটি বদ্ধ ট্যাংক বা অংশে শ্রমিকেরা কাজ করছিলেন। সেখানে কাজের সময় দুজন শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁদের উদ্ধারে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই অন্য শ্রমিকেরা বদ্ধ অংশে প্রবেশ করলে তারাও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন।
এর আগে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছিল, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কোন ধরনের গ্যাসে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। জাহাজ কাটার আগে সেটিকে সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করার নিয়ম রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজের বিভিন্ন ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাস থাকার সম্ভাবনা থাকে। গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজ কাটার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ইয়ার্ডটির নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
তবে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের শনিবারের পরিদর্শনে জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড শনাক্ত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। এখন গ্যাসটির উৎস, কীভাবে তা জাহাজের বদ্ধ অংশে জমেছিল এবং জাহাজ কাটার আগে নির্ধারিত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় দুর্ঘটনার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/180038