আমার শৈশবের সঙ্গী করতোয়া
আমির খসরু সেলিম : পঞ্চগড়। উত্তরাঞ্চলের একবারে প্রান্তিক জেলা। আবহাওয়া ভালো থাকলে বাসার উঠানে দাঁড়িয়েই দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্গা পাহাড়ের আলোকিত চূড়া। মাটি থেকে উচ্চতার কারণেই মনে হয়, নীল আকাশের মাঝে হঠাৎ বসিয়ে দেয়া হয়েছে ‘একটুকরো’ পাহাড়। সদর পেরিয়ে আরো উত্তরে এগিয়ে গেলে তেঁতুলিয়া উপজেলা। সেখানে বাংলাদেশের প্রান্ত। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকালে যে জায়গাগুলো খালি চোখে দেখা যায়, সেটাই ভারত। আধুনিক পঞ্চগড় অবশ্য এখন চা-বাগান আর পর্যটনের জন্য সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।
আশির দশকে যখন প্রথম সেই জেলায় পা রাখি, বেশ অবাক হয়েছিলাম। এখানকার গাছগাছালির সবুজ যেন একটু গাঢ়, শীত যেন একটু তীব্র, নদী যেন একটু বেশিই পরিষ্কার। আরেকটা ব্যাপার, এখানে দৈনিক পত্রিকা আসে দেরিতে। তখনো যমুনা সেতু তৈরি হয়নি। ফলে ঢাকার ছাপাখানায় যে দৈনিকটি প্রকাশ হতো, সেটা নানা ঝঞ্ঝা পেরিয়ে পঞ্চগড়ে পৌঁছাতে-পৌঁছাতে রাত হয়ে যেতো। কখনো আজকের দৈনিকটি পড়তে হতো আগামীকাল। একমাত্র ব্যতিক্রম দৈনিক করতোয়া। দৈনিক করতোয়াকেই একমাত্র কাছে পেতাম, যেটি দিনের পত্রিকা হিসেবে সেদিনই চলে আসতো। উত্তরাঞ্চলের খোঁজখবর একটু বেশি পরিমাণে থাকত বলে করতোয়ার প্রতি একটু বেশি আগ্রহও দেখতাম অনেকের মাঝে। তখন পর্যন্ত সাধারণত দৈনিকগুলি ছাপানো হতো সাদা-কালোতে। বেশিরভাগ পত্রিকা তখনো ছাপা হতো ‘লেটার-টাইপে’। তারপর যখন ছাপা-ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হলো, দৈনিক করতোয়াও আধুনিক হয়েছে।
পঞ্চগড়ের গিয়ে দেখলাম, ওখানকার নদীটিরও নাম করতোয়া। বেশ অবাকই হয়েছিলাম শুনে। ওখানকার করতোয়া আর বগুড়ার করতোয়াকে পাশাপাশি ‘ভেবে’ একটু হতাশই হতাম। ওখানকার করতোয়া ‘কত্ত’ বড়। বালুচর, কাশফুল, নদীর স্বচ্ছ পানি দেখে মনের ভেতর কেমন যেন লাগতো। বগুড়া শহরঘোঁষা করতোয়া দৈন দশা মন খারাপ করিয়ে দিতো। মনে ভেতর আরেকটা হাস্যকর ভাবনা নিয়ে তখন নিজেকেই সান্ত্বনা দিতাম। ভাবতাম এদের করতোয়া নদী থাকলেও দৈনিক করতোয়া তো নেই। শৈশবের সেইসব দিনগুলির ভাবনা হাস্যকর হলেও এখন ‘মধুর’ লাগে।
বাবার চাকরির সুবাদে এরপর বেড়িয়েছি নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা জেলাতেও। সব জায়গাতেই দৈনিক করতোয়ার দেখা পেয়েছি। প্রতিবারই মনে হতো, নিজের জন্মস্থান বগুড়া জেলার সঙ্গে এটাই যেন একধরনের যোগসূত্র তৈরি করে রাখছে। সুদূর খুলনা কিংবা কক্সবাজারের মতো জেলাতে ভ্রমণে গিয়েও যখন দৈনিকটির দেখা পেয়েছি, মনের মধ্যে অন্যরকম একটা অনুভব কাজ করেছে। অনুভবটা ভালো লাগার। নিজের জেলাকে ‘রিপ্রেজেন্ট’ করছে
এটা ভেবেও ভালো লাগতো। শৈশবে হয়তো ‘সিরিয়াস’ সংবাদের প্রতি তেমন মনোযোগ ছিল না। বরং যখন একটু লিখতে-পড়তে শিখলাম, তখন দৈনিক করতোয়ার শিশুতোষ পাতা ‘সবুজ আসর’ই আমাকে কাছে টেনে নিলো বেশি। শিশুদের জন্য বড়রা তো লিখছেনই। শিশুদের ‘কাঁচা’ হাতের লেখাও সেখানে যত্ন নিয়ে প্রকাশ হতো। ফলে নিয়মিত ‘সবুজ আসর’ পড়াটা প্রায় অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত তখন ‘সবুজ আসর’ মাসে দু’বার ছাপা হতো। সেহিসেবে অপেক্ষার পালাটাও ছিল দীর্ঘ।
আরেকটু বড় হয়ে যখন লেখালেখিটা শুরু করে দিলাম, তখন ভাবলাম, সবুজ আসরে কি আমার লেখা ছাপবে? তখন তো ‘ইন্টারনেটের’ যুগ ছিল না। কাগজে হাতে লিখে ডাকবিভাগের মাধ্যমে পাঠাতে হতো সবকিছু। আমিও তা-ই করলাম। তারপর শুরু হলো অপেক্ষার পালা। সেই অপেক্ষারও অবসান হলো। দৈনিক করতোয়ার সবুজ আসর পাতায় ছাপা হলো আমার নিজের লেখা। প্রথমদিকে ছড়া লিখেছি, তারপর গল্প ও ফিচার। প্রতিবারই আনন্দ পেয়েছি। পত্রিকা সংগ্রহ করে ছুটে গিয়েছি মায়ের কাছে। সেই আনন্দের মাত্রা আরো বেড়ে যেতো, যখন কোনো পরিচিত, বন্ধু বা আত্মীয় বলতো, তোমার লেখা দেখলাম ‘পেপারে’। লেখা প্রকাশের শুরুর দিকের সেইসব অনুভূতি, অনুভব নিখাঁদ আনন্দে জড়ানো থাকতো। এখন তো দৈনিক করতোয়া ‘পরিবার’কে অনেক কাছে থেকে দেখছি। সময়ের হাত ধরে সব আধুনিক হয়েছে। আঙুলের ডগায় চলে এসেছে অনলাইন সংস্করণ। দৈনিক করতোয়া দীর্ঘজীবী হোক।
লেখক: ছড়াকার, সংগঠক, সংবাদকর্মি।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/179705