দৈনিক করতোয়া এগিয়ে যাক সাফল্যের শীর্ষে
মোহাম্মদ নজাবত আলী : আমি ছাত্রজীবন থেকেই নিয়মিত পত্রিকা পড়তাম। আজিজুল হক কলেজে তিতুমীর হলে থাকতাম। সে আশির দশকে আজকের মতো এত পত্রিকা ছিল না। দৈনিক ইত্তেফাক,সংবাদ সেসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল। আমার প্রিয় করতোয়া যখন আস্তে আস্তে গণমানুষের আস্থা অর্জন করতে শুরু করে তখন থেকেই আমার করতোয়ায় লেখালেখি। সে ১৯৯৭ সাল থেকে অদ্যাবধি আমার করতোয়ায় লেখালেখির বয়স প্রায় ৩০ বছর। এ দীর্ঘ সময় আমি করতোয়া পত্রিকায় প্রচুর লেখা লেখি। আমার কর্মময় ও অবসর জীবন(১৯৮৯-২০২৩) একমাত্র করতোয়া আমার জীবন সঙ্গী। যাহোক, বর্তমান বিশ্বে প্রধানতম গণমাধ্যম হচ্ছে সংবাদপত্র। সংবাদপত্রকে বলা হয় বা সমকালের দর্পণ। সংবাদপত্র পাঠ না করা মানে মুক্ত বিশ্বের সাথে নিজের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা, ঘরের মাঝে দরজা, জানালা বন্ধ করে থাকা। কিন্তু বর্তমান তথ্য ও প্রযুক্তির যুগে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, সংবাদপত্র পড়েন না। বর্তমান ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দ্রুত আমরা জানতে পারলেও তাই বলে সংবাদপত্রের গুরুত্ব কোনো ভাবেই হ্রাস পায়নি। বরং সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এসেছে পরিবর্তন, বৈচিত্র্য। তাই সংবাদপত্র আমাদের জাতীয় জীবনের অনুসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংবাদপত্রে শুধু তথ্যের প্রচারক নয় একটি জাতির মেধা, মনন সত্য, ন্যায়বোধের জাগরণ ঘটায়। সকল প্রকার অনাচার, নির্যাতন, অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা ও অশুভ শক্তির বিনাশ সাধন করে সমাজকে পরিশুদ্ধ করার দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে সংবাদপত্র তা পালন করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সংবাদপত্র দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংবাদপত্রকে জনসাধারণের চোখ, কান, কণ্ঠস্বর হিসাবে কাজ করে। সংবাদপত্রকে বলা হয় । বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন, রক্ষা এবং গণতন্ত্রের বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা প্রশংসনীয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সরকারকে অবশ্যই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হতে হয় এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জনতার সংগ্রামে সংবাদ মাধ্যম সব সময় সামনের সাড়িতে থেকেছে। যেসব রাষ্ট্রে স্বাধীন মত প্রকাশ ও তথ্য জানার অধিকার সচল রয়েছে সেসব রাষ্ট্রে গণতন্ত্রও উন্নত হয়েছে। তাই আজকের দিনে সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, পৃথিবীতে আলোর উৎস দুইটি। একটি হচ্ছে- সূর্য আর দ্বিতীয়টি সংবাদপত্র। রাতের অন্ধকার শেষে ভোরে পূর্বাকাশে সূর্য উঠলে সে আলোতে মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে সমগ্র পৃথিবী। সংবাদপত্র মানুষের অন্তরে আলো জ্বালায় যার ফলে সমাজ হয় আলোকিত। সমাজের বা চিত্র সংবাদপত্রের পাতায় ফুটে উঠে। এজন্য সংবাদপত্রকে বলা হয়, সমাজের দর্পণ, চোখ। দর্পণ বা আয়না ছাড়া মানুষ যেমন নিজের চেহারা দেখতে পায়না। চোখ ছাড়া কোন মানুষ কিছুই দেখতে পায়না। তেমনি সংবাদপত্র ছাড়া কোন সমাজও এগিয়ে যেতে পারেনা। তাই আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সংবাদপত্রের গুরুত্ব অত্যধিক। আমেরিকার অন্যতম স্থপতি টমাস জেফারসন মুক্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতা এত জরুরি মনে করেন যে, তার একটি উক্তি থেকে তা সহজে অনুধাবন করা যায়। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমাকে যদি সংবাদপত্র বিহীন সরকার কিংবা সরকার বিহীন সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে কোনো একটি বেছে নিতে বলা হয়, কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই আমি দ্বিতীয়টিকে প্রাধান্য দিবো’ এ কথাগুলোর অর্থ হচ্ছে শাসন ব্যবস্থার চেয়ে স্বশাসন অনেক বেশি জরুরি।
আরো একটি সফল বছর পুরো করলো দৈনিক করতোয়া। ১৯৭৬ সালের ১২ আগস্ট যার পদযাত্রা। দেখতে দেখতে ৫০ বছর পুরো করে ৫১ বছরে পদার্পণ করলো। এ দীর্ঘ সময় অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে করতোয়া যে লাখো পাঠকের হৃদয় জয় করে নিয়েছে তার মূল্যও কম নয়। পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের সততা, আদর্শ, কর্মদক্ষতা সর্বোপরি নিরলস প্রচেষ্টায় করতোয়া সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। নিরপেক্ষতায়র পাশাপাশি দৈনিক করতোয়া কখনো নিজস্ব মতামত দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে না। বর্তমান ব্যক্তি স্বাধীনতার যুগে স্বাধীন মতামত প্রকাশের স্বার্থে প্রকৃত ঘটনা বের করা বড়ই কঠিন। এক্ষেত্রে করতোয়ার অভিজ্ঞ সাংবাদিকবৃন্দ তাদের বুদ্ধি, মেধা ও অক্লান্ত পরিশ্রম করে আসল তথ্য বের করার প্রাণান্ত চেষ্টা করে থাকেন। অযথা মিথ্যে সংবাদ পরিবেশন করে জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানোর নজির করতোয়ার নেই।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোন ঘটনায় কোন দলের প্রতি দুর্বল নয় বরং নিরপেক্ষতাই লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান নৈতিক অবক্ষয়ের যুগে চারদিকে শুধু নৈরাজ্য ও হতাশাই বিরাজ করছে। সরকারি ও বিরোধী দল তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্ব স্ব মতামতকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, আইনের শাসন, ন্যায় বিচার, জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারি দলের মতের কোন মিল নাও থাকতে পারে। কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যে, কোনটি ভাল, কোনটি মন্দ, কোনটি সাদা কোনটি কালো এগুলো অনেক সময় জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে জাতির জন্য মঙ্গল ও চিরায়ত কল্যাণকর সংবাদপত্র সেটাই প্রকাশ করবে।
এদিক থেকে বিচার করলে দৈনিক করতোয়া অনেক বেশি স্বচ্ছ ও সজাগ। তবে দেশে গণতন্ত্রকে বেশি শক্তিশালী করা, একটি দায়িত্বশীল সরকারের লক্ষ্যে জনমত গড়ে তোলা, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহাবস্থানে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, দেশে আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কে প্রকৃত অবস্থা সরকারকে সচেতন করা. ঘুষ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা, সর্বোপরি দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়নে যে কোন পত্রিকার যথেষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। সেক্ষেত্রে দৈনিক করতোয়ার ভূমিকা প্রশংসনীয়।
বর্তমান বিশ্বে অবাধ তথ্য প্রযুক্তির যেমন উন্নয়ন ঘটেছে তেমনি সারা পৃথিবীতে দ্বন্দ্ব সংঘাত বাড়ছে। এমতাবস্থায় মানুষের সুস্থ বিবেকের জাগরণ দরকার। জাতির বিবেক শক্তিকে জাগ্রত করতে সংবাদ পত্রের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কেননা মানুষের মনে সুস্থ ও কল্যাণের বার্তা বপন করে সাংবাদিকরা। এক্ষেত্রে সাংবাদিকতা একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পেশা যা একাধিক বার রিপোর্টে প্রকাশিত হয়। আর বাংলাদেশের সাংবাদিকরা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অতিতে অনেক সাংবাদিককে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে সাংবাদিকরা স্বাধীনতা ভোগ করবেন- এটাই স্বাভাবিক। কেননা সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র একই সূত্রে গাঁথা।
যাহোক, বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনে সংবাদপত্র বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রতিদিন অনেকগুলো পত্রিকা বের হয়। একটি পত্রিকা কখন জনপ্রিয়তা অর্জন করে ? সততা, নিষ্ঠা, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ, নির্ভীকতা, তথ্য ও উপাত্ত প্রকৃত ঘটনা পরিবেশনের মধ্য দিয়ে একটি পত্রিকা পাঠক সমাজে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বর্তমান বিশ্বে সামাজিক, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন সর্বোপরী পাঠকের রুচির দিকে নজর দিয়ে করতোয়া সর্বদা পাঠকের কাছাকাছি এসেছে। একটি পত্রিকার প্রধান বৈশিষ্ট হচ্ছে সর্বদা সত্য, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা। সেক্ষেত্রে করতোয়া অনেক এগিয়ে। অহেতুক, মিথ্যে, বানোয়াট সংবাদ পরিবেশনে বিরত থেকে করতোয়া সব সময় জাতীয় সংবাদ পরিবেশনের সাথে সাথে শুধু অত্র অঞ্চলেরই নয় সারা দেশে সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে বলেই করতোয়া পাঠক সমাজে বিশ্বস্ততা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। সংবাদপত্রে সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি অনেক সময় যে, স্বচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে বিখ্যাত মণীষী আইভান ভূর্গেনিভ বলেন, একটি বইয়ের একশত পৃষ্ঠা পাঠ করে যে জ্ঞান লাভ করা যায় সংবাদপত্রের একটি মাত্র ছবিতে একবার দৃষ্টি বুলিয়েই সে জ্ঞান লাভ করা যায়। সুতরাং সমাজ, দেশ, জাতির উন্নয়ন গণতন্ত্র বিকাশে সংবাদপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এক্ষেত্রেও করতোয়া পিছিয়ে নেই বরং এগিয়ে।
উত্তরাঞ্চলে পত্রিকার জগতে সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক করতোয়া। জাতীয় পত্রিকার সাথে এক সাথে জাতীয় খবরগুলো দৈনিক করতোয়াতেও প্রকাশিত হয়ে থাকে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খবর ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের মানুষের কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, বাণিজ্য, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশাজীবীদের সংগ্রামী জীবনের কথা করতোয়ার পাতায় তুলে ধরে। তাছাড়া সাহিত্য সাময়িকী, সবুজ আসরে গল্প, কবিতা প্রকাশে লেখক সৃষ্টিতে দৈনিক করতোয়া এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। করতোয়ায় রয়েছে একঝাঁক লেখক লেখিকা। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাংস্কৃতি সহ বিভিন্ন বিষয়ে লেখকরা তাদের লেখনির মাধ্যমে রাষ্ট্র, সমাজের কল্যাণ সাধনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একঝাঁক লেখক কোটি পাঠকের প্রত্যাশা পূরনে নিবেদিত প্রাণ।
এখন অবসর জীবনে সাংসারিক বিভিন্ন ঝামেলায় আগের মতো আর লেখা হয়ে ওঠে না। প্রবীণ সাংবাদিক যাহেদুর রহমান (যাদু) ও জওহর মল্লিক উনারা গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে। তাঁদের সাথে আমার ভালো সুসম্পর্ক ছিল। পরম শ্রদ্ধেয় সম্পাদক মোজাম্মেল হক (লালু) দৈনিক করতোয়ার উপদেষ্টা সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক ওয়াসিকুর রহমান (বেচান) তাঁদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। একই সাথে পত্রিকাটির পাঠক, লেখক, সাংবাদিক ও শুভানুধ্যায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি। দৈনিক করতোয়া সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে ৫১ বছরে পদার্পণ করায় আন্তরিকভাবে পত্রিকাটির সাফল্য কামনা করি। দৈনিক করতোয়া তার সততা, আদর্শ ও নিরপেক্ষতায় আরো পাঠক নন্দিত হোক। এগিয়ে যাক সাফল্যের শীর্ষে।
লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কলামিস্ট ,সহকারী শিক্ষক (অব:) ০১৭১৯-৫৩৬২৩১
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/179684