বগুড়ায় খাদ্যের নিরাপত্তা দিচ্ছে ‘উফশী ও হাইব্রিড’ জাত, বিলুপ্তির পথে দেশি ধান
স্টাফ রিপোর্টার : একসময় উত্তরাঞ্চলের খাদ্যভাণ্ডার বলে খ্যাত বগুড়া ও বরেন্দ্র অঞ্চলের বিলে-মাঠে শোভা পেত বিভিন্ন জাতের ঐতিহ্যবাহী দেশি ধান। হিজলী দিঘা, চিনিকানাই, বাওড়ী, খাসকানি কিংবা আসল নাজিরশাইলের সুবাসে মৌ মৌ করত কৃষকের উঠান। তবে কালের বিবর্তনে এবং বাড়তি জনসংখ্যার কারণে খাদ্যের চাহিদা মেটাতে গিয়ে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী এসব দেশি ধান এখন বিলুপ্তির পথে।
কম সময়ে বেশি ফলন পাওয়ায় কৃষকরা এখন শতভাগ ঝুঁকে পড়েছেন উচ্চফলনশীল (উফশী) ও সংকর (হাইব্রিড) জাতের ধান চাষে। বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে জেলায় স্থানীয় বা প্রথাগত জাতের ধানের উপস্থিতি বলতে গেলে এক শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। চলতি আমন মৌসুমে বগুড়ায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ মৌসুমে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৬১ হাজার ৮৮৩ মেট্রিকটন। উৎপাদনের এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কৃষকের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে আধুনিক ধানের জাত। মোট আবাদি জমির প্রায় ৮৫ শতাংশ (প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর) জুড়েই রোপণ করা হচ্ছে উফশী জাতের ধান, যার মধ্যে ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৮৭, রঞ্জিত ও স্বর্ণা অন্যতম।
অন্যদিকে, অতি-উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের আবাদ হচ্ছে ২৫ থেকে ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে (মোট আবাদের ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ)। নন্দীগ্রাম, কাহালু, শেরপুর, সদর ও গাবতলীসহ জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই এখন উফশী ও হাইব্রিড ধানের চাষাবাদ হয়।
স্থানীয় কৃষকগনের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রথাগত দেশি ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন যেখানে ছিল মাত্র দেড় থেকে ২ টন, সেখানে ব্রি-উদ্ভাবিত উফশী বা আধুনিক হাইব্রিড জাতের ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৮ টন পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। ফলনের এই বিশাল পার্থক্যের কারণেই বাধ্য হয়ে ঐতিহ্যবাহী জাতগুলো চাষাবাদে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন তারা।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট’র (বিআরআরআই) জিনব্যাংকে হাজার হাজার বিলুপ্ত ও বিরল দেশি জাতের বীজ অতিনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। বিআরআরআই’র বিজ্ঞানীরা জানান, হারিয়ে যাওয়া এসব দেশি ধানে ফলন কম হলেও এগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, সুগন্ধ এবং বন্যা বা খরা সহ্য করার মতো দুর্দান্ত জিনগত গুণাবলী রয়েছে।
এসব প্রথাগত ধানের জিন ব্যবহার করেই মূলত গবেষকরা জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল নতুন নতুন উফশী জাত উদ্ভাবন করছেন। জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়ার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উফশী ও হাইব্রিড ধানের কোনো বিকল্প নেই।
কারণ, দেশি জাতের ফলন কম, উফশী ও হাইব্রিড ধানের উৎপাদন তুলনামূলক অনেক বেশি। সঙ্গত কারণেই কৃষকরা সময়ের সাথে সাথে এসব জাত চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, তবে এ অঞ্চলের বিলুপ্তপ্রায় দেশি ধানের স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখতে জিনব্যাংকে সংরক্ষণের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে হলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দেশি ধানের অর্গানিক চাষ ধরে রাখা উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/179096