বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের সরকারবিরোধী আন্দোলন
নুসরাত জাহান (স্মরনীকা) : যখন কোনো গাছের শিকড় শুকিয়ে যায়, তখন যতই সবুজ পাতা দেখানোর চেষ্টা করা হোক না কেন, সেই গাছ টিকতে পারে না। রাষ্ট্রও অনেকটা সেই গাছের মতো যেখানে শাসকের স্বার্থপরতা, দুর্নীতি আর অবিচার শিকড়কে শুকিয়ে দেয়। তখন সাধারণ মানুষ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম রাজপথে নামে, নতুন বৃষ্টি আর নতুন। নতুন সূর্যের খোঁজে। আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে সরকারবিরোধী আন্দোলনের যে ঢেউ উঠছে, তা মূলত সেই পরিবর্তনের তৃষ্ণা থেকেই। বাংলাদেশ, নেপাল এবং লাতিন আমেরিকার দেশ পেরু তিনটি ভিন্ন ভূখন্ড, তিনটি ভিন্ন ইতিহাস। কিন্তু একটি সাধারণ সূত্রে এরা বাঁধা।
প্রত্যেক দেশেই মানুষ বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আর অর্থনৈতিক সংকট তরুণদের উত্তেজিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে রাজপথ সর্বত্র শোনা যাচ্ছে পরিবর্তনের দাবি।বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এর আগেও ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, কিংবা সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলন, ফ্যাসিস্ট বিরোধী জুলাই আন্দোলন বারবার প্রমাণ হয়েছে তরুণদের কাছে ন্যায়বিচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আজও তারা একইভাবে নতুন নেতৃত্বের দাবি করছে।
নেপালের তরুণ প্রজন্ম সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছে না। ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতির কারণে জনগণের আস্থা কমেছে। তরুণরা এখন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে সংগঠিত হচ্ছে, রাজনৈতিক জবাবদিহি দাবি করছে। পেরুতে পরিস্থিতি আরও জটিল। আন্দিয়ান অঞ্চলের কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্ররা মনে করছে ক্ষমতাসীনরা কেবল রাজধানীর স্বার্থে কাজ করছে। তাই তারা সড়ক অবরোধ, বিমানবন্দর অবরোধসহ তীব্র আন্দোলনের পথে গেছে। বাংলাদেশ, নেপাল কিংবা পেরু এ আন্দোলনগুলোর গভীরে গেলে দেখা যায় কিছু সাধারণ কারণ সর্বত্র মিলছে। যার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার অভাব। জনগণের বিশ্বাস হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গেলে নিজেদের স্বার্থে কাজ করে, দেশের মানুষের জন্য নয়। দুর্নীতি যেন একটি বৈশ্বিক রোগ হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বেকারত্ব এর অন্যতম কারণ। তরুণরা পড়াশোনা শেষ করেও কাজ পাচ্ছে না। অন্যদিকে ধনী-গরিবের ফারাক ক্রমেই বাড়ছে। এতে হতাশা তৈরি হচ্ছে। গণতান্ত্রিক কাঠামোর দূর্বলতা এখানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নির্বাচন না হওয়া, বিরোধীদের কণ্ঠ দমন করা, আইনের শাসন দুর্বল হওয়া এসব কারণে মানুষের আস্থা ভেঙে যাচ্ছে। আঞ্চলিক বৈষম্যও আন্দোলনের কারণ। রাজধানী বা কেন্দ্রীয় অঞ্চলে উন্নয়ন হলেও প্রান্তিক মানুষ মনে করছে তারা বঞ্চিত। পেরুত্ব আন্দিয়ান অঞ্চল, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা নেপালের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল সবখানেই একই অভিযোগ। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির প্রভাব পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক দেশের আন্দোলনকে আরেক দেশের তরুণদের দেখিয়ে অনুপ্রাণিত করছে। তারা বুঝতে পারছে পরিবর্তনের দাবির জন্য রাস্তায় নামা একটি বৈশ্বিক প্রবণতা হয়ে গেছে। আন্দোলন কেবল দমন করে থামানো যায় না। বরং এর কারণগুলো সমাধান করতে হবে। স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ যেন বিশ্বাস করতে পারে তাদের ভোটের মূল্য আছে। এটাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মসংস্থান ছাড়া হতাশ তরুণ সমাজকে শান্ত রাখা যাবে না। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্পোন্নয়ন ঘটাতে হবে।
দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিকে শাস্তি দিতে হবে কঠোরভাবে, রাজনৈতিক ক্ষমতাসীনদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক সমান উন্নয়ন করতে হবে। কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা জনগণকেও সমান সুযোগ ও অবকাঠামো সুবিধা দিতে হবে। তরুণ নেতৃত্বের সুযোগ প্রদান করতে হবে। পুরনো নেতৃত্বের বাইরে নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে জায়গা দিতে হবে। তাদের চিন্তা-ভাবনা রাজনীতিতে যুক্ত হলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বাংলাদেশ, নেপাল কিংবা পেরুর আন্দোলন ভিন্ন ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে হলেও আসলে একই কণ্ঠস্বর বহন করছে। তরুণ প্রজন্ম যেন বলছে আমরা দুর্নীতি চাই না, বৈষম্য চাই না, একচেটিয়া ক্ষমতা চাই না। আমরা চাই ন্যায়বিচার, সমান সুযোগ আর স্বাচ্ছ নেতৃত্ব। আজকের তরুণেরা কেবল রুটি-রুজির জন্য আন্দোলন করছে না, বরং তারা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা আর মানবিক মর্যাদার জন্য লড়ছে। এই আন্দোলনগুলো প্রমাণ করছে পৃথিবীর নতুন প্রজন্ম নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়তে চায়। যদি রাষ্ট্র তাদের কণ্ঠকে অস্বীকার করে, তবে ক্ষোভের আগুন আরও বাড়বে।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা [email protected]
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/178903