৫ আগস্টের শিক্ষা জাতির নিকট অনুসরণীয়

৫ আগস্টের শিক্ষা জাতির নিকট অনুসরণীয়

নজিবর রহমান জিয়া : বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫ আগস্ট/২৪ এর ঘটনা এবং নেপথ্যের ইতিহাস অতীব গুরুত্বের সাথে ইতিহাস লেখা থাকবে। ১৯৭১ সালের সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস যেমন এদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে তেমনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টও লেখা থাকবে। বাঙালি জাতির বীরত্বের কথা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেমন ১৯৭১ সালে এদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে এই বীর জাতির সন্তানেরা যে তাজা বুলেটের সামনে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও দাঁড়াতে পারে অকাতরে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে দেশ ও জাতিকে রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে তা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো ইতিমধ্যেই জেনে গেছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধ যেমন একদিনে বা একটি ঘটনার প্রেক্ষিত শুরু হয়নি; পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা নিপীড়ন ও বৈষম্যের কারণে ধীরে ধীরে যে ক্ষোভের আগুন দেশের ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী নির্বিশেষে সকল বয়সের জনগণের মধ্যে জ্বলতে শুরু করেছিল তা ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ০৯ মাস যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনী কে আগুনে পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছে। ফলে লক্ষ লক্ষ শহীদের এবং মা বোনদের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি সার্বভৌমত্ব বা স্বাধীন রাষ্ট্র। শহীদের রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্ত এই স্বাধীনতা দেশের একক কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল বা অন্য দেশের গোলামী করার জন্য স্বাধীন হয় নাই; একটি স্বাধীন দেশে গণতন্ত্র ব্যবস্থা চালু থাকবে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকার থাকবে। নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করবে এই প্রত্যাশা নিয়েই দেশ স্বাধীন হয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ, সুশাসনের অভাব, একনায়কতন্ত্র প্রস্তুতি পর্যায়ক্রমে দৃশ্যমান হয়। দীর্ঘ প্রায় ০৯ বছর শাসন করা স্বৈরশাসক হুসইন মুহাম্মাদ এরশাদ সরকারের পতন ঘটিয়ে ১৯৯১ সালে পুনরায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালের পর জনগণ আবারও ভেবেছিল এখন থেকে স্থিতিশীল সরকারের মাধ্যমে দেশের কাঙ্ক্ষিত সুষম উন্নয়ন হবে। দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সুশাসন ও ন্যায় বিচারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জবাবদিহিতা তৈরি হবে। তৎকালীন বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল, নৈরাজ্য, ভাঙচুর করে রাজপথ উত্তপ্ত করে। ০৫ বছর ধরে চলা এই আন্দোলন মোকাবেলায় সরকারকে অধিক মনোযোগী হতে হয়েছে। ফলে জনগণের সেই সেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয় করা সম্ভব হয়নি। 

এভাবেই দেশে সরকারের পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু দেশের রাজনৈতিক সহ অবস্থান, বা সহমতের কোন ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি বরং পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে। ২০০৮ সালে ১/১১ এর সরকারের আমলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় আওয়ামী লীগকে সরকারে বসানো হয়। প্রতিবেশী দেশের মদদে বা চিরদিন সরকারে থাকার নোংরা মানসিকতায় দেশের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ হস্তক্ষেপ করতে থাকে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতি নির্ধারণী নেতা কর্মীদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন গুম ও হত্যা করতে থাকে। রাজনীতিকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবেলা না করে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ক্ষমতা অবৈধভাবে প্রয়োগ করে অপরাজনীতির মাধ্যমে বিরোধী দলকে মোকাবেলা করে একক ক্ষমতার অধিকারী হতে শুরু করে। দেশের সরকারের বিরুদ্ধে বড় বড় আন্দোলন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে মোকাবেলা করে, এমনকি দলীয় গুন্ডা বাহিনী দ্বারাও মোকাবেলা করে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সাংবিধানিক অধিকারকে খর্ব করে দেশকে সংকটের দিকে নিয়ে যায়।

২০১৪ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে ভোট না হলেও ১৫৪ জন এমপি প্রার্থী এমপি নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণ করে সরকার গঠন করেন। ২০১৮ সালে একইভাবে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকাবস্থায় সরকারি সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে দিনের ভোট রাতেই করে পুনরায় সরকার গঠন করে। আওয়ামীলীগের নেতা কর্মিরা সরকারে থাকাবস্থায় দুর্নীতি, অপশাসন, ক্ষমতার দাপট, প্রভৃতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়। আওয়ামীলীগের ওয়ার্ড থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা ২০২৪ সালে একই দলের মধ্যে বিভিন্ন প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন দেখিয়ে নিজেরাই আবারও ক্ষমতায় থাকার জন্য অপকৌশল গ্রহণের অংশ হিসেবে সরকার গঠন করে। এতে সারাদেশের জনগণের মধ্যে ক্ষোতের জন্মলাভ করে। জনগণ আন্দোলনের জন্য প্লাটফর্ম খুঁজছিল। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাহিদ, সারজিস, আখতার, হাসনাত প্রভৃতি ছাত্র নেতৃত্ব প্রদানকারী অগ্রজদের ছাত্র-জনতা খুঁজে পায়। জুলাই/২৪ থেকে তাদের আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। কোটা সংস্কার দিয়ে আন্দোলন শুরু হলেও তা সময়ের প্রেক্ষাপটে ও প্রয়োজনীয়তা অনুসারে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্রদের ডাকে সারা বাংলাদেশে লক্ষ কোটি জনতা রাজপথে নেমে আসে। অমানবিক পৈশাচিক হত্যা, জখম, গুম, দমন, পীড়ণ এর মত সর্বোচ্চ নির্যাতনেও দমাতে পারেনি এদেশের ছাত্র জনতাকে। এমনকি মাকে চিঠি লিখে টেবিলে রেখে ছেলে আন্দোলনে যোগ দিয়ে শহীদ হয়েছেন। অনেকে আবার মায়ের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে আন্দোলনে এসে শহীদ হয়েছেন। সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহীনির বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে কুণ্ঠিত হয়নি ছাত্র জনতা। 

সারাদেশে সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই জুলাই আগষ্ট আন্দোলনে। ৪ই আগষ্টে পুরুষের পাশাপাশি নারী সমাজ বাড়ি থেকে রাজপথে এসে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সহকর্মীদের পানি, বিস্কুট, কলা দ্বারা আপ্যায়ন করতে দেখা গেছে। স্কুলের ছাত্র/ছাত্রীরা পোশাক পরে আন্দোলনে নেমে আসে। বুলেটের ভয় জনগণের মধ্যে থেকে যখন চলে যায় তখন সরকারের হাতে আর কিছু করার থাকে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বুলেট কিনে বা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন দিয়ে এই বেতনধারী কর্মচারীগণ এই বুলেট ব্যবহার করে মালিককে হত্যা বা নির্যাতন করবে তা জনগণ মেনে নেয়নি।

সরকার পতনের বড় চমক আসে ৪ই আগষ্ট/২৪ তারিখে। দলমত নির্বিশেষে ঐদিনই দেশের কর্তৃত্ব চলে আসে আন্দোলনকারী জনগণের হাতে। এর পরই ০৫ই আগষ্টে সরকার পদত্যাগ করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আমরা চাই আর কোন স্বৈরাচার সরকার যাতে এদেশের ক্ষমতার মসনদে না আসে। ক্ষমতার মসনদে থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার অপকৌশল হিসেবে জনগণের বুকে গুলি চালানো বা জনগণের উপর নির্যাতন চালানোর বিষয়টি জনগণ মেনে নিতে পারেনি। আর কোন রক্তপাত না হোক, আর কোন ৫ই আগষ্ট না আসুক, প্রশাসনও নিরপেক্ষ ভাবে আইন মোতাবেক দায়িত্ব পালন করুক এটাই কাম্য।


লেখক: গবেষক ও কলামিষ্ট। [email protected] ০১৭১৩-৩৭৭০৭৮

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/178902