দীর্ঘ অপেক্ষার পর গাজায় ১১২ ফিলিস্তিনির গণদাফন

দীর্ঘ অপেক্ষার পর গাজায় ১১২ ফিলিস্তিনির গণদাফন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুদ্ধ শুধু জীবন কেড়ে নেয় না, অনেক সময় মানুষকে তাদের প্রিয়জনের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করে। গাজার সাম্প্রতিক এক গণদাফনের দৃশ্য সেই নির্মম বাস্তবতাকেই আবারো সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে ইসরাইয়েলি হামলায় নিহত ১১২ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ দীর্ঘদিন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা ছিল। প্রায় দুই সপ্তাহের উদ্ধার অভিযানের পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করে একসঙ্গে দাফন করা হয়েছে।

গাজা সিটিতে অনুষ্ঠিত এই গণদাফনে হাজারো মানুষ অংশ নেন। নিহতদের মরদেহ সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। প্রতিটি মরদেহ ফিলিস্তিনি পতাকায় মোড়ানো ছিল এবং অনেকের ওপর তাদের ছবি রাখা হয়। পরে স্বজনরা অশ্রুসিক্ত চোখে তাদের শেষ বিদায় জানান।

নিহতদের বেশিরভাগই একই পরিবারের সদস্য। তাদের মধ্যে ৪৪ জন শিশু, ৩৮ জন নারী এবং সাতজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছিলেন। তারা ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর গাজা সিটির সাবরা এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন। হামলার সময় ভবনটিতে বহু সাধারণ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন।

উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে গাজার সিভিল ডিফেন্স বিভাগ। তাদের এই কাজে সহায়তা করেছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি)। ধ্বংসস্তূপ সরাতে খননযন্ত্র, সুরক্ষা সামগ্রী, দেহ সংরক্ষণের ব্যাগ এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সংস্থাটি উদ্ধারকর্মীদের সহযোগিতা করেছে।

উদ্ধারকাজ চলাকালে নিহতদের স্বজনরাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তারা উদ্ধারকর্মীদের ধ্বংসস্তূপের নিচে সম্ভাব্য মরদেহের অবস্থান চিহ্নিত করতে সহায়তা করেন। স্বজনদের ভাষ্য, হামলার পরপরই তারা যতগুলো মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব ছিল, তা করেছিলেন। তবে দীর্ঘদিন পর হলেও বাকি স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করে যথাযথভাবে দাফন করতে পেরে তারা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছেন।

নিহতদের একজন স্বজন নাহেদ আল-হাসাইনা তার পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বসার ঘরের ধ্বংসস্তূপ দেখিয়ে বলেন, “এটি এমন এক বেদনাদায়ক অনুভূতি, যা এখানে উপস্থিত প্রত্যেকের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে।”

দুই শিশুর ব্যবহৃত জিনিসপত্র হাতে তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন, “শিশুরা কী অপরাধ করেছিল? এটি ছিল ওমরের স্কুলব্যাগ, আর এটি ছিল ইব্রাহিমের জুতা। কেন? কেন তাদের হত্যা করা হলো?”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইউসুফ আবু শারিয়া বলেন, “আমি আমার পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য। আজ আমি এমন একজন মানুষ হিসেবে কথা বলছি, যে নিজের মা, বাবা, চাচা, চাচাতো ভাই-বোনসহ পুরো পরিবারকে হারিয়েছে। তারা সবাই এই ধ্বংসস্তূপের নিচেই প্রাণ হারিয়েছেন।”

স্থানীয়দের ধারণা, ঘটনাস্থলের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও আরও কয়েক ডজন মরদেহ চাপা পড়ে রয়েছে। পুরো গাজা উপত্যকাজুড়েই হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া অসংখ্য ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে তাদের অনেকের মরদেহ এখনো আটকে আছে।

স্বজনদের অনেকেই বলেন, এতদিন পর প্রিয়জনদের মরদেহ খুঁজে পাওয়া যেমন কষ্টের, তেমনি তাদের যথাযথভাবে দাফন করতে পারায় কিছুটা মানসিক শান্তি মিলেছে। একজন স্বজন বলেন, “আজ আমি আমার পুরো পরিবারকে হারিয়ে একা বেঁচে আছি। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন—সবাই এই ধ্বংসস্তূপের নিচেই প্রাণ হারিয়েছেন।”

স্থানীয় কর্মকর্তাদের ধারণা, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও আরো অনেক মরদেহ চাপা পড়ে আছে। গাজা জুড়ে হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ, যাদের অনেকের দেহাবশেষও বিভিন্ন ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়ে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গাজার এই গণদাফন আবারো মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরাই সংঘাতের সবচেয়ে অসহায় শিকার হয়ে ওঠে। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগ আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/178840