গ্যাস সংকটে বাড়ছে লোডশেডিং
করতোয়া ডেস্ক : দেশজুড়ে একসঙ্গে তিন সংকটে নাকাল সাধারণ মানুষ। জুন-জুলই মাসের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ যখন তুঙ্গে, তখনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট এবং শিল্পাঞ্চলে জ্বালানির ঘাটতি জনভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও বিল এসেছে দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি। এরই মধ্যে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। ফলে একদিকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের চাপ, অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস না পাওয়ার বাস্তবতায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দেশের মানুষ।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, তালিকাভুক্ত ১৪৩টির মধ্যে অন্তত ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তরল জ্বালানিভিত্তিক ও দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে গত ২২ জুলাই দুর্ঘটনার পর পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ ১৭ শতাংশের বেশি কমে গেছে। ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
গত সপ্তাহে দৈনিক গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮২ মেগাওয়াট, আগের সপ্তাহে যা ছিল ৩২০ মেগাওয়াট। ঘণ্টাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ১ আগস্ট বিদ্যুতের ঘাটতি ২ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াটে পৌছায়। গত রোববার ভোরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট।
বাসাবাড়িতে ও সিএনজিতে দুর্ভোগ : ঢাকার রামপুরা, মিরপুর, উত্তরা,মগবাজার, মোহাম্মদপুর, আদাবরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা কয়েক দিন ধরে রান্নার চুলায় গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। অনেক এলাকায় গভীর রাতেও গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। ঘড়ির কাঁটা ধরে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকেন অনেক গৃহিণী। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। অনেক স্টেশন দিনের বড় সময় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় নামানো বন্ধ করেছেন।
শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ: এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে একই ধরনের অভিযোগ এসেছে। রাতের সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেককে মোমবাতি বা চার্জলাইটের আলোয় পড়তে হচ্ছে। তাহিরপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হোসেন আহমদ তৌফিক বলেন, সন্ধ্যা হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে শিশুদের পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে না। অন্যদিকে আড়াইহাজারের অটোরিকশাচালক মোহসিন মিয়া বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি চার্জ দিতে পাড়নে না। এক সেনা গাড়ি চালালে আরেক বেলা বসে থাকতে হয়। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্রামাঞ্চলে ভোগান্তি বেশি : লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে জেলা ও গ্রামাঞ্চলে। অনেক এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র পাঁচ ঘন্টা বিদ্যুৎ মিলছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর আবার এক বা দুই ঘণ্টা লোডশেডিং এখন অনেক এলাকার নিত্যদিনের ঘটনা। ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার একটি চালকলের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, একদিনে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কার্যত বন্ধ ছিল। আগে দুই-জি ঘণ্টার লোডশেডিং কোনোভাবে সামলানো যেত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। কুমিল্লার মাছচাষি রহমত উল্লাহ জানান, বিদু্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালাতে টানা তিন রাত লেগেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি কাজও দিধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা : শিল্পের পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগও চরম আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, রামপুরা, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। অনেক পরিবার গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে রান্না করছেন। কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। এতে আবার বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। ঘন্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না অনেকে। এতে কর্মঘণ্টার বড় অংশ লাইনে কাটছে এবং আয় কমে যাচ্ছে।
সরকারের আশ্বাস : গ্যাস সংকট নিয়ে সরকারও প্রকাশ্যে দ্যুখ প্রকাশ করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি সরকারি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব দ্রুত পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও বলেছেন, গ্যাস সংকট পুরোপুরি কবে শেষ হবে, সে প্রতিশ্রুতি এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ক্ষতিগ্রান্ড এলএনজি টার্মিনালের মেরামত কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতে পারে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/178720