অনলাইন জুয়ার খপ্পরে শিক্ষার্থীরা: জয়ের প্রলোভন, ধ্বংসের বাস্তবতা
তাপস রায় শুভ : একসময় জুয়া ছিল নির্দিষ্ট কিছু আড্ডা কিংবা গোপন আসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আজ প্রযুক্তির অগ্রগতিব সঙ্গে সেই জুয়া চলে এসেছে হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনে। কয়েকটি ক্লিক, একটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণীয় প্রচারণাই যথেষ্ট একজন শিক্ষার্থীকে অনলাইন জুয়ার জগতে টেনে নেওয়ার জন্য। দ্রুত অর্থ উপার্জনের মোহ, রাতারাতি সফল হওয়ার স্বপ্ন এবং সহজ লাভের প্রলোভন এই তিনটি অস্ত্র ব্যবহার করেই অনলাইন জুয়ার চক্র তরুণ সমাজকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এব সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
কয়েকটি অনলাইন জুয়ার সেরা প্লাটফর্মের মধ্যে ভার্চুয়াল জুজু, ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং, বোভাডা ইত্যাদি ব্যাপকভাবে নিজেদের ব্যবসাকে প্রসারিত করছে। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অনলাইন জুয়ার বেড়াজালে আবদ্ধ, যার সিংহভাগই তরণ এবং স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। মোবাইল ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে এই আসক্তি গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও মারাত্মক আকার থাকা করেছে। বর্তমান সময়ে অনলাইন জুয়া কেবল একটি অবৈধ বিনোদন নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মানসিক সংকটে রূপ নেওয়া এক নীরব মহামারি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষার্থীদের জুয়ায় আসক্ত হওয়া, ঋণের বোঝায় জর্জবিত হওয়া, পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করা কিংবা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
অথচ এই সংকট নিয়ে সমাজে এখনো পর্যাপ্ত আলোচনা ও প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এব সহজলভ্যতা। কোনো ক্যাসিনোতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; একটি স্মার্টফোনই যথেষ্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পেজ, টেলিগ্রাম চ্যানেল কিংবা বিদেশভিত্তিক ওয়েবসাইটে রঙিন বিজ্ঞাপন দিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করা হয়। শুরুতে সামান্য লাভ দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা হয়, এরপর বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড় হারায়, কিন্তু তখন পর্যন্ত সে নেশার মতো এই চক্রে আটকে যায়। এই আসক্তির পেছনে কয়েকটি সামাজিক কারণও রয়েছে। বেকারত্বের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, বন্ধুদের প্রভাব, সামাজিক মাধ্যমে বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রদর্শন এবং অল্প সময়ে ধনী হওয়ার মানসিকতা তরুণদের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, পড়াশোনা বা পরিশ্রমের চেয়ে অনলাইন বাজিতেই হয়তো দ্রুত অর্থ উপার্জন সম্ভব কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
জুয়ার নিয়ম এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয় পরিচালনাকারীরা, আর ক্ষতির বোঝা বহন করে সাধারণ অংশগ্রহণ-কারীরা। শিক্ষার্থীদের জীবনে এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। পড়াশোনায় অমনোযোগ, পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল, অনিদ্রা, উচ্চো, হতাশা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা এসবই অনলাইন জুয়ার সাধারণ পরিণতি। অনেকেই ধার দেনায় জড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ পরিবারের অজান্তে অর্থ আত্মসাৎ করে, আবার কেউ প্রতারণা বা সাইবার অপরাধের পথ বেছে নেয়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে তাঁর পুরো ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এই ভয়ঙ্কর ব্যাধিকে রুখে দিতে কিছু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, আমাদের পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, অর্থের অস্বাভাবিক চাহিদা বা গোপনীয়তা বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সচেতনতা, আর্থিক শিক্ষার গুরুত্ব এবং অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। শুধু শাস্তি নয়, কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ শনাক্ত করে দ্রুত বন্ধ করা, অবৈধ আর্থিক লেনদেন কঠোরভাবে নজরদারিতে আনা এবং জুয়ার প্রচারণাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী সংস্থা এবং গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট ব্রাউজিং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পর্যবেক্ষণে কোনো শিক্ষার্থীর অসংগতি দেখা দিলে ওই শিক্ষার্থীকে বিশেষভাবে সতর্ক করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার তরুণ প্রজন্ম। তারা যদি অনলাইন জুয়ার নেশায় নিজেদের মেধা, সময় ও স্বপ্ন হারিয়ে ফেলে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি। তাই এই সমস্যাকে শুধু আইন শৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে নয়, বরং শিক্ষা, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবাইকে সম্পৃক্ত করে মোকাবিলা করতে হবে। প্রযুক্তি আমাদের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যদি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন কেড়ে নেওয়ার অস্ত্রে পরিণত হয়, তবে উন্নয়নের সব অর্জনই প্রশ্নের মুখে পড়বে। এখনই সময় দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার। কারণ আজ একজন শিক্ষার্থীকে অনলাইন জুয়ার হাত থেকে ফিবিয়ে আনতে পারলে, আগামীকাল আমরা একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি সম্ভাবনাময় বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারব।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/178594