বগুড়ার নন্দীগ্রামে উচ্চফলনশীল জাতের আবাদে ঝুঁকছেন কৃষক, বিলুপ্তির পথে দেশীয় ধানের জাত
নন্দীগ্রাম (বগুড়া) প্রতিনিধি : বর্ষার অনুকূল আবহাওয়ায় বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার মাঠজুড়ে শুরু হয়েছে আমন ধানের চাষাবাদ। কৃষকেরা বীজতলা থেকে চারা তুলে জমিতে রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সবুজে ছেয়ে গেছে উপজেলার মাঠ-ঘাট। তবে উৎপাদন বাড়ানোর এ প্রতিযোগিতায় ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে একসময়ের জনপ্রিয় দেশীয় জাতের ধান।
অধিক ফলন, স্বল্প সময়ে উৎপাদন এবং ভালো বাজারমূল্যের কারণে কৃষকেরা এখন আগাম ও উচ্চফলনশীল জাতের ধানের আবাদে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে নন্দীগ্রাম উপজেলায় ১৯ হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ এবং ৭০ হাজার ৩৫১ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে উপজেলার ১ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে বীজতলা প্রস্তুত করা হয়েছে। এবার উল্লেখযোগ্যভাবে ব্রি ধান-৩৪, ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৫১, ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৯০ ও ব্রি ধান-১০৩ জাতের ধানের আবাদ হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ ও প্রবীণ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সময় নন্দীগ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠে বাতরাজ, পাইজাম, খাটো বাদাল, কাটারিভোগ, কালোজিরা, ঝিঙাশাইল ও বিন্নি জাতের ধানের ব্যাপক চাষ হতো। এসব দেশীয় ধানের চালের স্বাদ, ঘ্রাণ ও পুষ্টিগুণ ছিল অনন্য। বিশেষ করে পায়েস, পোলাও ও বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরিতে এসব ধানের চালের ব্যাপক কদর ছিল।
কিন্তু ফলন তুলনামূলক কম, পরিপক্ব হতে বেশি সময় লাগে, ঝড়-বৃষ্টি ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বেশি এবং বাজারে উচ্চফলনশীল জাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারায় কৃষকেরা ধীরে ধীরে এসব জাতের আবাদ থেকে সরে আসছেন। বর্তমানে উপজেলার এসব জাতের ধান বিলুপ্তির পথে।
নন্দীগ্রাম পৌর এলাকার দক্ষিণপাড়ার কৃষক মনসুর আলী বলেন, ছোটবেলায় আমাদের মাঠে পায়জাম, খাটো বাদাল, বাতরাজসহ নানা দেশীয় জাতের ধান দেখা যেত। এখন সেগুলো খুঁজে পাওয়াই কঠিন। ব্রি ধানের আগাম জাতগুলোতে ফলন বেশি, সময় কম লাগে এবং বাজারদরও ভালো পাওয়া যায়। তাই কৃষকেরা বাধ্য হয়ে উন্নত জাতের ধান চাষ করছেন।
এতে উৎপাদন বাড়লেও আমাদের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় ধানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উপজেলার প্রতিটি মাঠেই কৃষকরা আমন ধানের চাষাবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভাটরা ইনিয়নের তেঘর গ্রামের কৃষক আক্কাস আলী তালুকদার বলেন, আগাম জাতের আমন ধান চাষে প্রতি বিঘায় জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার, আগাছা পরিষ্কার, কীটনাশক ও শ্রমিক মজুরিসহ প্রায় ১৩ থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। উৎপাদন ভালো হলে লাভও ভালো হয়।
তাই অধিকাংশ কৃষক আগাম জাতের দিকেই ঝুঁকছেন। শ্রমিক আব্দুল হাকিম বলেন, এখন ধান রোপণের মৌসুম। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে কাজ করছি। কাজের চাপ বেড়েছে, পাশাপাশি আয়ও আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।
এদিকে উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে বর্তমানে ব্রি ধান-৯০ তিন হাজার ২শ থেকে তিন হাজার ৩শ টাকা, মিনিকেট এক হাজার ৪শ থেকে এক হাজার ৫শ টাকা, কাটারিভোগ এক হাজার ৭শ থেকে এক হাজার ৮শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
নন্দীগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম কামাল বলেন, নন্দীগ্রাম উপজেলাকে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম শস্যভান্ডার বলা হয়। এ উপজেলার উৎপাদিত ধান স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। এখানকার কৃষকেরা অত্যন্ত পরিশ্রমী ও কৃষিবান্ধব।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে তারা প্রতিবছর উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের ধানের আবাদ বাড়াচ্ছেন। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় জাতের ধান সংরক্ষণেও উদ্যোগ নিতে হবে। এসব ধানের সঙ্গে আমাদের কৃষি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সম্পর্ক রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গাজিউল হক বলেন, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমনের আবাদ সম্পন্ন হবে বলে আমরা আশাবাদী। বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন।
সুষম সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কাঙ্খিত উৎপাদন অর্জন সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশীয় জাতের ধানের সংরক্ষণেও কৃষি বিভাগ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/177978