সিজোফ্রেনিয়া কী, চিকিৎসা সম্পর্কে যা জানা জরুরি
লাইফস্টাইল ডেস্ক : একদিনের পর দিন রিতা নিজের ঘরেই চুপচাপ বসে থাকে। পরিবারের কারো সঙ্গে কথা বলতে চায় না। বাইরে বের হলে মনে হয়, পথচারীরা তার মনের কথা পড়ে ফেলছে। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো মানসিক চাপের কারণে এমন হচ্ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন উপসর্গই হতে পারে সিজোফ্রেনিয়া নামের গুরুতর মানসিক রোগের লক্ষণ।
বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে বেশিরভাগ রোগীই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। কিন্তু অবহেলা করলে এই রোগ ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ-সব ক্ষেত্রেই বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
সিজোফ্রেনিয়া কী?
সিজোফ্রেনিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল মানসিক রোগ, যা মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ, আচরণ এবং বাস্তবতা উপলব্ধির ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বাস্তব ও কল্পনার পার্থক্য করতে পারেন না। ফলে তিনি এমন কিছু দেখতে, শুনতে বা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।
পুরুষ ও নারী উভয়ই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত ২০ থেকে ২২ বছর বয়সে এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে রোগটি প্রথম প্রকাশ পায়।
যেসব লক্ষণ দেখা যায়
সিজোফ্রেনিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিভ্রম। রোগী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এমন কিছু, যার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। অনেকের মনে হয় কেউ তাকে অনুসরণ করছে, ক্ষতি করতে চাইছে অথবা তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে।
আরেকটি সাধারণ লক্ষণ হ্যালুসিনেশন। এতে রোগী এমন শব্দ শুনতে পারেন, যা অন্য কেউ শুনতে পান না। অনেকেই অদৃশ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, অবাস্তব দৃশ্য দেখেন কিংবা অদ্ভুত গন্ধ বা স্পর্শ অনুভব করেন।
অনেক রোগীর চিন্তাভাবনা ও কথাবার্তাও বিশৃঙ্খল হয়ে যায়। একটি বিষয় থেকে হঠাৎ অন্য বিষয়ে চলে যাওয়া, অসংলগ্নভাবে কথা বলা কিংবা যুক্তিহীন আচরণ এ রোগের পরিচিত লক্ষণ।
এছাড়া মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হওয়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো কগনিটিভ সমস্যাও দেখা দেয়।
অনেক রোগীর আবেগ প্রকাশ কমে যায়। পরিবার, বন্ধু বা সামাজিক পরিবেশ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি অনীহা, খুব কম কথা বলা এবং জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা সিজোফ্রেনিয়ার নেগেটিভ উপসর্গ হিসেবে বিবেচিত হয়।
যে কারণে এই রোগ হয়
সিজোফ্রেনিয়ার একক কোনো কারণ এখনো নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়কে ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো বংশগত প্রভাব। বাবা বা মায়ের একজন আক্রান্ত হলে সন্তানের ঝুঁকি বেড়ে যায়। উভয় অভিভাবকের মধ্যে রোগটি থাকলে সেই ঝুঁকি আরও বেশি হয়।
এছাড়া মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক পদার্থের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলেও রোগটি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ডোপামিনসহ কিছু নিউরোট্রান্সমিটারের অস্বাভাবিকতা আচরণ ও চিন্তায় বড় প্রভাব ফেলে।
শৈশবের মানসিক আঘাত, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি, অতিরিক্ত মানসিক চাপ কিংবা বিষাক্ত সামাজিক পরিবেশও সিজোফ্রেনিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
যেভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়
সিজোফ্রেনিয়া নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক পরীক্ষা নেই। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, পারিবারিক ইতিহাস এবং আচরণ মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা বা ব্রেইন ইমেজিং করা হতে পারে, যাতে অন্য কোনো শারীরিক কারণ আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
সাধারণভাবে অন্তত ছয় মাস ধরে উপসর্গ থাকলে এবং তা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করলে সিজোফ্রেনিয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়।
সিজোফ্রেনিয়ার সম্পূর্ণ নিরাময় না হলেও নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ, যা বিভ্রম, হ্যালুসিনেশন ও অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনা কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি সাইকোথেরাপি রোগীকে বাস্তবতা বুঝতে, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং দৈনন্দিন জীবন দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে সহায়তা করে।
প্রোডাক্টিভিটির নামে নিজের মনোযোগ হারাচ্ছেন না তো
রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে বা নিজের কিংবা অন্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হলে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে। সিজোফ্রেনিয়া মানেই জীবন শেষ নয়। বরং এটি এমন একটি মানসিক রোগ, যার ক্ষেত্রে যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়, সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/177924