জুলাই শহীদ রাজিবের বাবা-মা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ছেলে হত্যার বিচার চাই

জুলাই শহীদ রাজিবের বাবা-মা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ছেলে হত্যার বিচার চাই

রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের জয়কুমর গ্রামের জুলাই যোদ্ধা বীর শহীদ স্কাউটার রাজিব উল করিম সরকার রাব্বীর মা জান্নাতুল ফেরদৌস গত শুক্রবার তার প্রয়াত ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মেধাবী সন্তান রাজিব লালমনিরহাটে বাবা-মায়ের চাকরির সুবাদে সেখানে বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলে ভর্তি হয়। সেখানে অবস্থানকালীন ৪ আগস্ট সে ছাত্র বিক্ষোভে অংশ নেয়। ৫ আগস্ট আন্দোলনে অংশ নিতে লালমনিরহাট জেলার মিশন মোড়ে অবস্থান নেয়।

এরপর থেকে তার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। রাত দেড়টার দিকে তাকে সে সময় লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন খানের বাসায় আগুনে পোড়া মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তিন ভাইয়ের মধ্যে মেধাবী রাজিবকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল বাবা-মায়ের। কিন্তু অকালেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় সে। তার এই মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না তারা বাবা-মা। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার বুকফাঁটা কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা।

রাজিবের বাবা রেজাউল করিম সরকার লালমনিরহাটে অবস্থিত বেগম কামরুন্নেছা ডিগ্রি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস লালমনিরহাট জেলার কালিগঞ্জ উপজেলায় এটিও হিসেবে কর্মরত। তাদের তিন পুত্র সন্তানের মধ্যে রাজিব সবার বড়। সে লালমনিরহাট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেল। ৭টা পরীক্ষা দিয়েছিল সে। তার মেঝো ভাইয়ের নাম জামিউল করিম সরকার এবং ছোট ভাই মেজবাহ উল করিম সরকার।

মা জান্নাতুল ফেরদৌস জুলাই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, জুলাই আন্দোলনে ছেলের অংশগ্রহণ, ছেলের শৈশবের দিনকাল ও ছেলের ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। জুলাই নিয়ে রাজিবের মা জানান, প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে ভালো এবং মন্দ আছে। কিছু মানুষের জন্য জুলাই পজেটিভ, কিছু মানুষের জন্য তো নেগেটিভ। যারা নেগেটেভ তারা তো বলবেই জুলাই একটা গাদ্দারি, জুলাই এটা-সেটা-আর সব কথা তো কানে নেওয়াও যাবে না।

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কাঁদতে ঁকদতে রাজিবের মা জানান, ৫ আগস্ট রাজিব আন্দোলনে যাওয়ার পর রাত প্রায় ১১টার পর থেকে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায় এবং তার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এ বিষয়ে রাজিবের মা জানান, আমার ছোট ছেলে বলে মা বিপদে পড়লে একটা দোয়া পড়তে হয়, জায়নামাজ বিছিয়ে এই দোয়া তিনবার পড়লে তাহলে তুমি তাড়াতাড়ি একটা খবর পাবে।

আমি এক সেকেন্ড দেরি না করে দোয়াটা পড়েই চলেছি। ওই পড়া অবস্থায় আমি ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়েছি। রাজীবকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কেউ পেয়ে থাকলে জানাবেন! ১০টা ৫৬ পর্যন্ত তার মোবাইলে রিং যাচ্ছিল। চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার পর অফ হয়ে যায়।

সে মিশন মোড়ে ছিল, তারপর ওই বাড়িটার দিকে যায়। রাত দেড়টার দিকে আমার ছোট দেবর ফোন করে হাউমাউ করে কাঁদছিল! আমি তখনই কিছু বুঝতে পারলাম। তখন আমার সেন্স চলে গেছে। আমি ওই জায়নামাজে বসে সন্তানের মৃত্যুর খবর পাই। আমি একবার শুধু সন্তানের লাশ দেখেছি। আমার ছেলের দাড়ি চুল একটাও পুড়ে যায়নি। কিছুই পোড়েনি। আল্লাহ তাকে এত হেফাজতে রেখেছে। একদম চকচকে সাদা হিরার মত আমার ছেলেটা কালো হয়ে গেছে। ধোঁয়াতে আগুনে কালো হয়ে গেছে।

ছেলেকে নিয়ে রাজিবের বাবা বলেন, আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ৬১৯ নাম্বার গেজেট তার। অথচ স্বাধীন দেশে আবার আমরা স্বাধীনতার যুদ্ধ করি। সব হারিয়ে গেল আমার। ছেলেটা আমার শুধু ছেলে ছিল না, ও আমার বন্ধু ছিল।

ওকে আমি ভুলতেই পারছি না। একসাথে বিছানায় থাকা, গোসল করানো, স্কুলে-প্রাইভেটে নিয়ে যাওয়া আসা সব নিজ হাতে করেছি। ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে রাজিবের বাবা-মা আরও বলেন, আমি চাই সুষ্ঠু কদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিচার হোক।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/177623