হরমুজ প্রণালী এড়াতে নতুন পাইপলাইনের ভাবনায় মধ্যপ্রাচ্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল পারস্য উপসাগরীয় তেল পরিবহন করা হতো। তবে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর বড় একটি অংশ এই সমুদ্রপথ এড়িয়ে অন্য পথে পাঠানো সম্ভব হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীর ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকা এবং তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে তারা লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ও ওমান উপসাগরের তীরবর্তী বন্দরগুলোর দিকে তেলের সরবরাহ ঘুরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
সরকারি কর্মকর্তা, তেল কোম্পানি এবং বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, বর্তমানে অন্তত সাতটি বড় পাইপলাইন প্রকল্প নির্মাণাধীন, পরিকল্পনাধীন অথবা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। তবে হরমুজের বিকল্প পথগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কেননা এই সপ্তাহে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা দেখিয়েছে, তারা লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী সৌদি সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ওপর অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে।
কিন্তু এই সংঘাত উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে; তারা এখন ইরানের উপকূল ঘেঁষে থাকা এই পরিবহন পথের ওপর নির্ভরতা কমাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে বিকল্প পথে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে দীর্ঘ ও অধিক ব্যয়বহুল পথ পাড়ি দিতে হবে।
তথ্য ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ভিক্টোরিয়া গ্রাবেনভোগার বলেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর এতটা বেশি নির্ভর করা ‘দীর্ঘমেয়াদে আর কোনো বিচক্ষণ কৌশল নয়’।
লোহিত সাগর এবং ওমান উপসাগর বিকল্প হয়ে উঠেছে
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তেহরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এমন আশঙ্কায় ১৯৮০-র দশকে সৌদি আরব একটি পাইপলাইন নির্মাণ করেছিল। সেই পাইপলাইনটি না থাকলে হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়াটা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরও বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াত।
সৌদি আরবের ‘পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন’ দেশটির মরুভূমির মধ্য দিয়ে আবকাইক-এর প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থেকে লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর ইয়ানবু পর্যন্ত তেল পরিবহন করে। সেখানে পৌঁছানোর পর তেল ট্যাংকারে ভরা হয় এবং সেগুলো আরব সাগরের দিকে দক্ষিণে অথবা সুয়েজ খালের দিকে উত্তরে রওনা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ওমান উপসাগরের তীরবর্তী ফুজাইরাহ বন্দরে আরও বেশি তেল পাঠাচ্ছে; এই বন্দরটি হরমুজ থেকে প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার (৮৫ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্রের ‘এনার্জি ইনফরমেশন এজেন্সি’-র তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে এই দুটি পাইপলাইনের সম্মিলিত অতিরিক্ত সক্ষমতা ছিল দৈনিক প্রায় ৩৫ লাখ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল। বর্তমানে পাইপলাইন দুটি তাদের পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি পর্যায়ে চলছে। আগামী বছরের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের মাধ্যমে আরও বেশি তেল পরিবহন শুরু হতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি আমিরাতের অন্যতম আবুধাবির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ফুজাইরাহ পর্যন্ত ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৩০০ কোটি ডলার ব্যয়ের একটি পাইপলাইন নির্মাণের কাজ ত্বরান্বিত করছে। বিদ্যমান একটি পাইপলাইনের সমান্তরালে নির্মিতব্য এই পাইপলাইনটির লক্ষ্য হলো ফুজাইরাহে তেল সরবরাহের পরিমাণ দৈনিক ১২ লাখ ব্যারেলেরও বেশি বৃদ্ধি করা।
‘কেপলার’-এর তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর আগেই শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ এখন প্রায় অর্ধেক সম্পন্ন হয়েছে। আগামী বছরের শুরুর দিকে পাইপলাইনটির কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও, কেপলারের মতে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে এটি সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি; কারণ ফুজাইরাহ বন্দর সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
কেপলারের গ্রাবেনওগার বলেন, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সময়সীমাটি কেবল ‘হরমুজ প্রণালী অবরোধের প্রেক্ষাপটেই বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে উঠেছে’।
তুরস্ক ও সিরিয়ায় আরও বেশি তেল সরবরাহের পরিকল্পনা
ইরাকের কর্মকর্তারা বসরা-সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলীয় তেল ক্ষেত্রগুলো থেকে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ তৈরির পরিকল্পনা জোরদার করছেন। হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরাকের নির্ভরতা বেশি হওয়ায় তাদের তেল উৎপাদন কমিয়ে আনতে হয়েছে।
তেল বিক্রি থেকে আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্জনকারী ইরাকি সরকার মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রকল্পের আওতায় বসরার তেল টার্মিনাল (যেখান দিয়ে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ৩০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল রপ্তানি হতো) থেকে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের তুরস্কের জেইহান বন্দরে তেল পরিবহন করা হবে।
এই পাইপলাইনের একটি শাখা সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর বানিয়াস পর্যন্তও বিস্তৃত থাকবে। শেষ পর্যন্ত এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বানিয়াস বন্দরে পৌঁছাতে পারবে; মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই পথটিকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
পাশাপাশি বসরা থেকে আকাবা পর্যন্ত তেল পরিবহনের জন্য দীর্ঘদিনের আলোচিত একটি পাইপলাইন প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জর্ডানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন ইরাকি কর্মকর্তারা। আকাবা থেকে লোহিত সাগর বা সুয়েজ খালের মাধ্যমে এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে সেই তেল রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
নতুন পাইপলাইনে সময় ও খরচ বাড়াবে
বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে যাওয়ার জন্য গৃহীত নতুন প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে আগামী বছরের শেষ নাগাদ দৈনিক ৩৮ লাখ ব্যারেল এবং ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ দৈনিক ৭৩ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব হবে।
তাদের ভাষ্যমতে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুদ্ধের আগে দৈনিক যে ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হতো, তার প্রায় ৬০ শতাংশই হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকবে।
পারস্য উপসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পাইপলাইনগুলো তেলকে বিপরীত দিকে নিয়ে যায়, যা হরমুজ হয়ে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল এশীয় দেশগুলোর জন্য খুব একটা সহায়ক নয়। তেলকে তার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
সৌদি আরব থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করা হবে, তাও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার ঝুঁকির মুখে পড়বে; এই বিদ্রোহীরা অতীতে বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে (যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে) জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়েছে।
ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল বোঝাই করা জাহাজগুলো বিকল্প হিসেবে সুয়েজ খাল ব্যবহার করতে পারে; কিন্তু এই খালে শিল্পের বৃহত্তম ট্যাঙ্কারগুলোর চলাচলের ব্যবস্থা নেই। অথচ প্রতিটি ট্যাঙ্কারে ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল ধরে এবং দীর্ঘ দূরত্বে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে এরাই প্রায়শই সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
এমনকি ইরান থেকে অনেক দূরে অবস্থিত পাইপলাইনগুলোও আধা-সামরিক বাহিনী ‘রেভোলিউশনারি গার্ড’ কিংবা ওই অঞ্চলে তাদের মিত্র উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর হামলার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। ২০১৯ সালের মে মাসে হুথিদের ড্রোন হামলার কারণে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম (ইস্ট-ওয়েস্ট) পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।
উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি শিল্প যখন হরমুজ প্রণালীর বাইরে দিয়ে তেল সরবরাহের পরিকল্পনা করছে, তখন তাদের সামনে আরও একটি জটিল ও ব্যয়বহুল সমস্যা রয়ে গেছে যার সমাধান এখনো হয়নি। যুদ্ধের আগে বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বড় একটি অংশ কাতার থেকে আসত। যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশও এই প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হতো।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/177355