বগুড়ায় তিন দশকে বেড়েছে সাড়ে ১০ লাখ মানুষ, নেপথ্যে বহিরাগতদের আগমন
নাসিমা সুলতানা ছুটু : উত্তরাঞ্চলে জনসংখ্যার শীর্ষে অবস্থান করছে বগুড়া জেলা। গত ত্রিশ বছরে এই জেলায় বড়েছে প্রায় ১১ লাখ মানুষ। বাড়তি জনসংখ্যার বড় অংশই এসেছে বাইরের জেলা থেকে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসার কারণে আশে-পাশের জেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের বসতির প্রথম পছন্দে পরিণত হয়েছে উত্তরাঞ্চলের এই প্রানকেন্দ্র।
ফলে স্থানীয়ভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে বহিরাগতদের আগমনই এখন বগুড়ার জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধানতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই আবাসন চাহিদার জেরে জেলাজুড়ে ফসলি জমি থেকে শুরু করে শহরের বাণিজ্যিক এলাকার জমির দাম বাড়ছে অবিশ্বাস্য গতিতে।
শহরের বড়গোলা মোড়ে প্রায় দুই যুগ ধরে ধরে বাদাম বিক্রি করছেন শের আলী। তার এই শহরে আসার গল্পটি আরও পুরোনো। তিন যুগ আগে ব্রাক্ষণবাড়িয়া থেকে শের আলীর এক আত্মীয় বগুড়ায় বাদাম বিক্রি করতে আসেন। বগুড়ায় ব্যবসার ভালো পরিবেশ দেখে কর্মের তাগিদে একে একে তার অনেক আত্মীয়ও এই শহরে চলে আসেন।
বর্তমানে শের আলীর আত্মীয় স্বজনসহ তারা প্রায় ১৫ জন বগুড়ায় বাদাম ভাজা বিক্রির ব্যবসার সাথে জড়িত। শহরের থানা মোড়, সাতমাথা, নবাববাড়ি রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা বাদাম বিক্রি করেন। অধিকাংশেরই পরিবার এখন বগুড়ায় থাকেন বলে জানান শের আলী। তিনি বলেন, ‘বগুড়া শহর আমাদের আপন করে নিয়েছে, এখানকার মানুষ ও ব্যবসা দুটোই ভালো। তাই ব্রাক্ষণবাড়িয়া ছেড়ে আমরা এখন স্থায়ীভাবে বগুড়ারই মানুষ।’
একইভাবে ২০০৯ সালে বৃহত্তর নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর জেলা থেকে বগুড়ায় ব্যবসা করতে এসেছিলেন দেলোয়ার হোসেন। অল্প দিনেই ব্যবসা জমে ওঠায় বাড়ি থেকে নিজের ছোট ভাই এবং ভাগ্নেকেও বগুড়ায় নিয়ে আসেন। ব্যবসার প্রসারের পাশাপাশি দেলোয়ার বগুড়াতেই বিয়ে করেন এবং জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দেলোয়ার বলেন, উত্তরবঙ্গের সব জেলার সাথে বগুড়ার যোগাযোগ ভালো। ব্যবসার জন্য এর চেয়ে ভাল শহর আর হয় না।’
শের আলী কিংবা দেলোয়ারের মতো ব্যবসা, চাকরি ও জীবিকার প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের এই স্থায়ী আবাস গড়ে তোলাই বগুড়ার জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী উত্তরের ১৬ জেলার মধ্যে বগুড়ার জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আর সবচেয়ে কম জয়পুরহাটে।
বগুড়ার জনসংখ্যা ৩৭ লাখ ৩৪ হাজারের কিছু বেশি, আর জয়পুরহাটে ৯ লাখ ৫৬ হাজার। বগুড়া পরিসংখ্যান ব্যুরো অফিস জানায় জনশুমারি অনুযায়ী ১৯৯১ সালে বগুড়ার জনসংখ্যা ছিলো ২৬ লাখ ৬৯ হাজার আর ২০২২ সালের জনশুমারির গণনায় বগুড়ার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭ লাখ ৩৪ হাজার। এছাড়া ২০০১ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ছিলো ৩০ লাখ ১৩ হাজার এবং ২০১১ সালে ৩৪ লাখ ১ হাজার।
জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম বা নাটোর থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার স্থায়ীভাবে বগুড়ায় চলে আসছে। এই বিশাল অভিবাসনের ফলে বগুড়া এখন উত্তরাঞ্চলের প্রধান ‘মাইগ্রেশন হাব’। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধু লোকসংখ্যাই নয়, জনসংখ্যার ঘনত্বেও বগুড়া অনেক এগিয়ে। বগুড়ায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১ হাজার ২১২ জন মানুষ বসবাস করেন।
বগুড়া জেলা পরিসংখ্যান অফিসের উপপরিচালক মোঃ সোহেল রানা জানান, ভৌগোলিক অবস্থান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উন্নত চিকিৎসাসেবার কেন্দ্র হওয়ায় আশপাশের জেলা তো বটেই, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের প্রথম পছন্দ বগুড়া। বগুড়ার জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার সাধারণ জন্মহারের চেয়ে অনেক বেশি। এর মূল কারণ ‘ইন-মাইগ্রেশন’ বা বহিরাগতদের আগমন।
এই জেলায় স্থানান্তরের হার অন্য যেকোনো জেলার চেয়ে অনেক বেশি, যা জনসংখ্যা দ্রুত বাড়িয়ে তুলছে।
অতিরিক্ত জনসংখ্যার এই চাপ শহরের নাগরিক সেবার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। প্রতিনিয়ত আবাসন ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ায় যানজট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ‘বাইরের জেলার মানুষ যখন একটি শহরে এসে স্থায়ী হয়, তখন সেই শহরের চরিত্র বদলে যায়। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় শহরের পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ট্রাফিক জ্যাম নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
জমির দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে পরিকল্পিত নগরায়ণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সংকটে পড়বে। এই বিশাল জনসংখ্যার চাপ সামলাতে এবং শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদী মাস্টার প্ল্যান নিয়ে কাজ করছি। ধীরে ধীরে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/177120