স্পেনই সেরা, তবে সেরা দলটিই সবসময় জেতে না: জেরার্ড পিকে

স্পেনই সেরা, তবে সেরা দলটিই সবসময় জেতে না: জেরার্ড পিকে

২০১০ সালের বিশ্বকাপ জয়ী তারকা জেরার্ড পিকে বলেছেন, এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে সুন্দর ও সেরা ফুটবল খেলে ফাইনালে উঠেছে স্পেন। তবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী মহারণের আগে দলকে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছেন সাবেক এই ডিফেন্ডার।

তার মতে, লিওনেল মেসিকে মাঠে আটকে রাখা কেবল ব্যক্তিগতভাবে পাহারা বা 'ম্যান-মার্কিং' করার চেয়েও অনেক বেশি জটিল এক সমীকরণ।

স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস- কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেরার্ড পিকে জানান, কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যদের যদি দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে হয়, তবে ম্যাচের পুরো ৯০ মিনিট জুড়েই নিজেদের চেনা ছন্দ ও খেলার নিজস্ব ধরন ধরে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, ‌‘আর্জেন্টিনা ম্যাচের শুরু থেকেই মাঠে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করবে, ওটাই ওদের চিরচেনা স্টাইল। স্পেনকে কোনোভাবেই ওদের সেই আগ্রাসী রূপের সামনে ভড়কে গেলে চলবে না। আমাদের নিজেদের ফুটবলের ওপরই শতভাগ আস্থা রাখতে হবে। যদি বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রাখা যায় এবং হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলা যায়, তবে স্পেনের জেতার সুযোগ অনেক বেড়ে যাবে।

বার্সেলোনার দিনগুলো থেকে মেসির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু পিকে। ৩৯ বছর বয়সেও মাঠের ভেতরে মেসির অবিশ্বাস্য ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা ও ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ তিনি। পিকে বলেন, ‘মেসি সবসময় মাঠের ভেতর সবচেয়ে সেরা সমাধানটি বের করে নেয়। তাকে আটকানোর জন্য আপনি একজন, দুজন কিংবা তিনজন ডিফেন্ডার রাখলেন কি না, তাতে মেসির কিছুই যায় আসে না। সে ঠিকই বের হওয়ার পথ খুঁজে নেবে। আর যখন সবার মনোযোগ একা মেসির দিকে থাকে, তখন সে দলের বাকিদের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করে দেয়। তাই মনে রাখতে হবে, আর্জেন্টিনা দলটা শুধু মেসির ওপর নির্ভরশীল নয়।’

তিনি আরও বলেন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেসি নিজের খেলার ধরন বদলে নিয়েছেন, কিন্তু নিজের প্রভাব একটুও কমতে দেননি। পিকের ভাষায়, ‘মেসি খুব ভালো করেই জানে যে ২৫ বছর বয়সের সেই তরুণ দেহের গতি বা শক্তি এখন আর তার নেই। কিন্তু প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে ঠিক কোন জায়গায় আঘাত করতে হবে, সেটা সে নিখুঁতভাবে বোঝে। তার এই ফুটবলীয় প্রতিভা আসলেও অনন্য।’

পিকে বলেন, এই ফাইনালে যদি আর্জেন্টিনা জিতে যায়, তবে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা হিসেবে মেসির অবস্থান আরও মজবুত হবে। তিনি বলেন, ‘নিজের ক্যারিয়ারের বৃত্তপূরণ করার এর চেয়ে সুন্দর বিদায় আর হতে পারে না। অনেকেই তাকে ইতিমধ্যে ইতিহাসের সেরা বলে মানেন, তবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতলে সেই দাবি নিয়ে আর কোনো তর্কের অবকাশ থাকবে না।’

তবে ব্যালন ডি'অর জয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পিকে। তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটির মানদণ্ড অস্পষ্ট হয়ে গেছে। পিকে বলেন, ‘আজকাল ব্যালন ডি'অর দেওয়ার ক্ষেত্রে ঠিক কী বিবেচনা করা হয়, তা আমি নিজেও বুঝি না। মেসি যদি বিশ্বকাপ জেতে, তবে অনেকে হয়তো বলবে সে তো এমএলএস-এ খেলে, তাই এর গুরুত্ব কম। আবার স্পেন যদি চ্যাম্পিয়ন হয় আর পুরস্কারটি রদ্রি কিংবা লামিনে ইয়ামাল পায়, তা নিয়েও সমালোচনা হবে। পুরস্কার দেওয়ার আসল ক্রাইটেরিয়া বা নিয়মটা কখনোই পরিষ্কার নয়।’

নিজের দেশ স্পেনের শক্তির ওপর পূর্ণ আস্থা থাকলেও, আর্জেন্টিনা যে নিজেদের যোগ্যতায় ফাইনালে এসেছে তা মনে করিয়ে দিতে ভুলেননি পিকে, দলগত পারফরম্যান্সের দিক থেকে আমার চোখে স্পেনই এই বিশ্বকাপের সেরা দল। তবে যারা ফাইনালে পা রাখে, তারা সেই যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই আসে। আর ফুটবলে তো সবসময় সেরা খেলা দলটিই ট্রফি উঁচিয়ে ধরে না।

স্পেনের বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে তাদের ২০১০ সালের সোনালী প্রজন্মের সাথে তুলনা করার বিষয়ে পিকে বেশ আশাবাদী। বর্তমান দলটি আরও উঁচুতে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। সমালোচকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আজ সবাই বলে আমাদের সেই প্রজন্মের ক্যারিশমা বা জাদুকরী রূপ বেশি ছিল, কিন্তু সেটা তো দীর্ঘ ১৬ বছর পার হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। অথচ ২০১০ বিশ্বকাপেও আমাদের নিয়ে মানুষের মনে অনেক সংশয় ছিল।

আমরা প্রথম ম্যাচেই সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বসেছিলাম এবং খুব কম মানুষই আমাদের ওপর ভরসা রেখেছিল। আমি নিশ্চিত পেদ্রি, লামিনে ইয়ামাল কিংবা পাউ কুবার্সির মতো তরুণদের নিয়ে গড়া এই দলটিও আমাদের সমান, এমনকি আমাদের চেয়েও ভালো করতে পারে। ওদের শুধু একটু সময় দেওয়া প্রয়োজন।’

পিকে আরও বলেন, মেসির সাথে আজীবনের বন্ধুত্ব থাকলেও ফাইনালে তার মন থাকবে স্পেনের দিকেই। তবে প্রিয় বন্ধু ট্রফি জিতলেও খুব একটা মন খারাপ হবে না তার। তিনি বলেন, ‘আমি অবশ্যই চাইবো স্পেনই জিতুক। তবে আর্জেন্টিনা যদি চ্যাম্পিয়ন হয়, আমি মেসির জন্য সমানভাবে আনন্দিত হবো। ফুটবলার জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর এখন আমি মাঠের ফুটবলকে একদম অন্যভাবে দেখতে পারি স্রেফ সুন্দর খেলার নিখাদ আনন্দ উপভোগ করার জন্য।’

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/176804