ইন্ধনদাতাদের সন্ধানে মাঠে গোয়েন্দারা
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলন ঘিরে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশের পরও কারা আন্দোলনের নামে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উসকে দিচ্ছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারা এ আন্দোলনকে পুঁজি করে ফায়দা নিতে চায়। এসব প্রশ্ন ও অভিযোগের উত্তর খুঁজতে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক টিম। চলছে নানামুখী অনুসন্ধান ও তদন্ত।
ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের নানা লোকজনের সম্পৃক্ততার আভাস মিলেছে। কয়েকটি কেস স্টাডি হাতে নিয়ে প্রযুক্তিগত চুলচেরা বিশ্লেষণের কাজও এগিয়ে চলছে।
এদিকে ‘১২ কোটি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়েছি’ বলা ভাইরাল ছাত্রী মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী নয়। অথচ রহস্যজনক কারণে সে এই কলেজের পরীক্ষার্থী দাবি করে প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার তার বিরুদ্ধে তুরাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে।
সূত্র জানায়, আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীর পারিবারিক ও রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড অনুসন্ধান করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্দোলন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো হয়েছে সেগুলো নিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ইউনিট।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার এসব বিষয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই ছাত্রদের এ ধরনের আন্দোলনের পেছনে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উসকানি ও অভিযোগ ছিল। নতুন করে বর্তমান সরকারকে বিব্রত করা এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে মহল বিশেষ পানি ঘোলা করে ফায়দা নেওয়ার অপচেষ্টা করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দৃশ্যমান আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনেকেই প্রকৃত শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থী নয় বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে। এই ছদ্মবেশী মহলের ইন্ধন ও সম্পৃক্ততার বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তবে সারা দেশে দু-একটি জেলা এবং ঢাকার কয়েকটি স্পট ছাড়া আন্দোলনকারীদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। ফলে বিষয়টিকে খুব একটা বড় সংকট বলে মনে করছে না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তিনি জানান, ‘পেছনে যেই থাকুক না কেন, সামনে তো আমরা আছি।’
সূত্র জানায়, আন্দোলন চলাকালীন বিভিন্ন স্পট থেকে যেসব ভিডিও চিত্র ধারণ করা হয়েছে সেগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সচিবালয় বা সরকারি ভবনের সামনে চলমান বিক্ষোভে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা স্বাভাবিক আন্দোলনের অংশ হওয়ার কথা নয়। এমনটিই মনে করছেন অনুসন্ধানসংশ্লিষ্টরা। ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করে সূত্রটি বলছে, ৫ থেকে ৭টি নির্দিষ্ট মুখকে অত্যন্ত বেপরোয়া ও উসকানিমূলক ভূমিকায় দেখা গেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আড়ালে থাকা এই নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ভাইরাল মেয়েটির বিরুদ্ধে জিডি : এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে ‘১২ কোটি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়েছি’ বক্তব্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া রুবাইয়া মেহজাবিন সূহি (ইবান) বর্তমানে মাইলস্টোন কলেজের ছাত্রী নয় বলে জানিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার ঢাকার তুরাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মাইলস্টোন কলেজের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মুহাম্মদ জহুরুল ইসলাম বাদী হয়ে তুরাগ থানায় জিডি করেন। যার নম্বর-৯০৫।
জিডির বিবরণ থেকে জানা যায়, রুবাইয়া মেহজাবিন সূহি মাইলস্টোন কলেজের (কলেজ কোড- ৮০৭৪) বিজ্ঞান বিভাগের (ইংরেজি মাধ্যম) ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। তবে শৃঙ্খলাজনিত কারণে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষে তাকে মাইলস্টোন কলেজ থেকে ইতঃপূর্বে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) প্রদান করা হয়। এর ফলে বর্তমানে উক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বা কলেজের পরিচয় ব্যবহার করার কোনো আইনগত অধিকার নেই।
অভিযোগে বলা হয়, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই শিক্ষার্থী মাইলস্টোন কলেজের আইডি কার্ড ব্যবহার করে চলমান এইচএসসি পরীক্ষা ও প্রশ্নপত্রসংক্রান্ত আন্দোলনে সরকারবিরোধী ও চরম উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেছে। সে মাইলস্টোন কলেজের শিক্ষার্থী না হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানের ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এবং কলেজের সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কলেজের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে নিরাপত্তা কর্মকর্তা মুহাম্মদ জহুরুল ইসলাম বাদী হয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
তুরাগ থানা পুলিশ সূত্র জানায়, ডায়েরির বিষয়টি তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সাব-ইন্সপেক্টর মো. আরিফুল ইসলাম রানাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে তদন্ত শুরু করেছেন।
ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, শিক্ষার্থীদের অন্দোলন ঘিরে কোনো অপশক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে কিনা তা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।