৩১ দফা: বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা

৩১ দফা: বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা

বিগত ১৭ বছর আওয়ামী  শাসন আমলে  দেশের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান একে একে দলীয়করণ করে  ধ্বংস করা হয়েছে। মূলত এই  প্রতিষ্ঠান গুলো আওয়ামীলীগের দলীয় প্রতিষ্ঠান এবং দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করেছে । এই প্রতিষ্ঠান গুলো সংস্কার করা অপরিহার্য ছিল । সংবিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা ঘোষণা করেছেন তারেক রহমান যা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে রূপরেখা।

৩১ দফার উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরা হল : 

বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা : দীর্ঘদিন আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম ভোট দিতে পারে নাই ,অনেকের জন্মের পর এক বারও ভোট দেন নাই বা ভোটার হবার পর এক বারও ভোট কেন্দ্রে  যাবার  সুযোগ হয়নি। তাই  বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি ‘নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করার কথা বলা হয়েছে এই ৩১ দফায়। যার মাধ্যমে এদেশের মানুষ ভোটের অধিকার ফিরে পাবে।

ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ : এক ব্যক্তি একাধিকবার ক্ষমতায় থাকলে  একনায়কতন্ত্র মনোভাব জন্ম নেয় তাই ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য একজন ব্যক্তি পরপর দুই টার্মের অতিরিক্ত কেউ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবে না বলা হয়েছে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য আনার  লক্ষ্যে নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচারবিভাগের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যর সুসমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও স¤প্রীতিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ৩১ দফার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য । এ জন্য অব্যাহত আলোচনা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সামাজিক চুক্তিতে পেঁৗছানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে ।  

দেশ পুনঃ গঠনে জনগণ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নির্বাচন কমিশন সংস্কার: সমৃদ্ধ দেশ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ  গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত এবং বিশিষ্টজনের অভিমতের ভিত্তিতে স্বাধীন, দক্ষ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন করার লক্ষ্যে বর্তমান ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’ সংশোধন করা হবে। ইভিএম নয়, সব কেন্দ্রে পেপার—ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদান নিশ্চিত করা হবে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন সংস্কার করা হবে।

এছাড়াও সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে সকল রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠান আইনি সংস্কারের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ  জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি “প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন” গঠন করে প্রশাসন সংস্কার ও পুনঃগঠন করার  প্রস্তাব করা হয়েছে। মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনা করার  প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে নির্মিত হবে সৎ  দক্ষ ও মেধাবী প্রশাসন।

গণমাধ্যমের পূর্ণস্বাধীনতার নিশ্চয়তা: বিগত ১৭ বছর গমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে কিছু ছিলনা— একটি দলের প্রচার মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অসংখ্য সংবাদ মাধ্যম। অথচ গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ এবং জাতির বিবেক হিসেবে কাজ করে থাকে। তাই গণমাধ্যমের পূর্ণস্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান ও সার্বিক সংস্কারের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি, মিডিয়া সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীএবং বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য মিডিয়া ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠন করার কথা বলা হয়েছে। সৎ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সকল কালাকানুন বাতিল ও চাঞ্চল্যকর সাগর—রুনি হত্যাসহ সকল সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যার বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া  হবে। 

দুর্নীতি দমন অর্থনীতি পুনঃ উদ্ধার মূল্যস্ফীতি রোধ : বিগত ১৭ বছর দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট করে দেশের অর্থনীতি পংগু করা হয়েছে  তাই দুর্নীতির  ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। গত দেড় দশকব্যাপী সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং শ্বেতপত্রে চিহ্নিত দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশের বাইরে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও দুর্নীতি দমন আইন সংস্কারের পাশাপাশি পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে 'দুদকের' স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ করা হবে।অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও গবেষক, অভিজ্ঞ ব্যাংকার, কর্পোরেট নেতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি সমন্বয়ে একটি ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করার কথা বলা আছে ।প্রবৃদ্ধির সুফল সুষম বণ্টনের মাধ্যমে ধনী—দরিদ্রের বৈষম্য দূর করা হবে।   মুদ্রাস্ফীতির আলোকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হবে। শিশু—শ্রম বন্ধ করে তাদের জীবন বিকাশের উপযোগী পরিবেশ ও ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং  নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা হবে। পাটকল, বস্ত্রকল, চিনিকলসহ বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

স্বাস্থ্যসেবা প্রবর্তন করে সবার জন্য স্বাস্থ্য কার্ড চালু :ভেঙ্গে পড়েছে স্বাস্থ খাত স্বাস্থ্য সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পেঁৗছাতে এর সংস্কার জরুরি। উন্নত  স্বাস্থ্যসেবা প্রবর্তন করে সবার জন্য স্বাস্থ্য কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া  হবে। জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫% অর্থ বরাদ্দ করা হবে। স্বাস্থ্যকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ ও ‘বিনা চিকিৎসায় কোনো মৃত্যু নয়’ এই নীতির ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যের আদলে সর্বজনীন করা হবে।

বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান নৈরাজ্য দূরীকরণ : বর্তমানে যে শিক্ষা ব্যবস্থা আছে তা মূলত সৃজনশীলতার নামে  সিলেবাস পরিবর্তন করে একটা মেধাহীন প্রজন্ম  গড়ে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর করে নিম্ন ও মধ্য পর্যায়ে চাহিদা—ভিত্তিক শিক্ষা এবং উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা আছে । গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হইবে   ক্রমান্বয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্টখাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট সকল খাতকে ঢেলে সাজানো হবে। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং উৎপাদান খাতে গবেষণা ও উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ক্রীড়া উন্নয়ন ও জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে ।

কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং জলবায়ু মোকাবেলা : কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে  তাই পর্যায়ক্রমে সকল ইউনিয়নে কৃষিপণ্যের জন্য সরকারি ক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা হইবে। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও শস্য বীমা, পশু বীমা, মৎস্য বীমা এবং পোল্টি্র বীমা চালু করা হবে। কৃষি জমির অকৃষি ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হবে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন এবং গবেষণার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কর্ম—কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এতদসংশ্লিষ্ট রফতানিমুখী কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প খাতকে প্রণোদনা দেওয়া হবে।জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট ও ক্ষতি মোকাবিলায় টেকসই ও কার্যকর কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে। নদী  ও জলাশয় দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বন্যা ও খরা প্রতিরোধে খাল—নদী খনন পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। সামুদ্রিক সম্পদের বিজ্ঞান সম্মত জরিপ ও মজুদের ভিত্তিতে তা আহরণ এবং অর্থনৈতিক ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

৩১ দফা মূলত দেশ পুনঃ গঠনে এক মহাপরিকল্পনা যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে  এবং  এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি সেই শহীদদের স্বপ্ন পূরণ হবে।


লেখকঃ

আল আমিন নাহিদ

প্রকৌশলী ও কলামিস্ট 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/176480