কৃষি ঋণ মওকুফ: প্রান্তিক কৃষকের প্রাপ্তি ও আগামীর পথ

কৃষি ঋণ মওকুফ: প্রান্তিক কৃষকের প্রাপ্তি ও আগামীর পথ

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং প্রান্তিক কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলাসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ সরকার কৃষকদের কৃষি ঋণ প্রদান করে থাকে। এই কৃষি ঋণের মাধ্যমে কৃষকরা উন্নত বীজ, সার এবং সেচের সুবিধা পায়, যার ফলে কৃষির উৎপাদন বাড়ে এবং দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হয়। এছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি, ন্যায্যমূল্য না পাওয়াসহ বিভিন্ন সংকটে কৃষকদের স্বস্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে সরকার কৃষি ঋণ মওকুফ করে থাকে। সদ্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও শপথ গ্রহণের পরে ১৫৫০ কোটি টাকা কৃষি ঋণ মওকুফের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় কৃষি ঋণের সুবিধা কি সত্যিই প্রকৃত কৃষকের হাতে পেঁৗছায়? ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত কি তাদের আর্থিক দুঃখ—দুর্দশা সম্পূর্ণভাবে লাঘব করতে সক্ষম হয়? কৃষি ঋণ পাওয়া এবং কৃষি ঋণ মওকুফের সাথে প্রান্তিক কৃষকদের সম্পৃক্ততা থাকার কথা থাকলেও গ্রামাঞ্চলে অভিযোগ রয়েছে যে, যাদের প্রয়োজন সেই ক্ষুদ্র কৃষকদের অনেকেই তালিকার বাইরে থেকে যান। অন্যদিকে প্রভাবশালী বড় ঋণগ্রহীতা বা মধ্যস্বত্বভোগীরা নানা উপায়ে সুবিধা নিয়ে নেন। আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা, তথ্যের ঘাটতি ও স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতার অভাব প্রকৃত কৃষকের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে মওকুফের ঘোষণা থাকলেও তার সুফল অনেক সময় সীমিত পরিসরে আটকে যায়।

 প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ বড় অসহায়। প্রকৃতিকে পিছনে ফেলে মানুষ সামনে এগোতে পারেনা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, অতিবৃষ্টি, ঘণবর্ষা, আবাদি ফসল নষ্ট হওয়া বিভিন্ন কারণে প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের পৃথিবী বদলে গেছে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর পরিবর্তন ও বৈশ্বিক ক্ষুধা মন্দা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ আমাদের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাবে ফেলায় কৃষক সমাজ সমস্যাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। 
যদি কৃষি ঋণ ও কৃষি ঋণ মওকুফের সুফল প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে না—ই পেঁৗছায়, তাহলে এই কৃষি ঋণ মওকুফের যৌক্তিকতা কী? কৃষি ঋণ মওকুফের পূর্বে মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রকৃত কৃষকরা সুবিধা পেয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঋণ মওকুফ সাময়িক স্বস্তি দিলেও কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করে না। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না এলে এবং বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা না ফিরলে কৃষক বারবার একই চক্রে আবর্তিত হবেন। তাই কেবল ঋণ মওকুফ নয়, দরকার কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, সহজ শর্তে নতুন ঋণ, স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে কঠোর নজরদারি।

সর্বোপরি, মওকুফকৃত ঋণের সুবিধা প্রকৃত কৃষক ভোগ করেছেন কি না, এর উত্তর এককথায় দেওয়া কঠিন। কেউ উপকৃত হয়েছেন, কেউ বঞ্চিত। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে এবং প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার দিলে এই উদ্যোগ সত্যিকার অর্থেই কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। কৃষকের হাসিই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি; সেই ভিত্তি মজবুত করাই হওয়া উচিত আমাদের অগ্রাধিকার।

লেখক :

ইশতিয়াক ইসা

শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ, 
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/176348