জনসংখ্যা জনসম্পদে পরিণত হোক
পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানব ও মানবী বাবা আদম এবং মা হাওয়া হতে সৃষ্ট কোটি কোটি বছর ধরে গোটা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সন্তানদের মানব সভ্যতার স্বর্ণ শিখরে অবস্থান করা অবস্থায় মনোবাসনা জাগ্রত হয় পৃথিবীতে জনসংখ্যা কতো। তাই কালক্ষেপণ না করে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় আদমশুমারী। সেই মোতাবেক গণনা শেষে ১৯৮৭ সালের ১১ই জুলাই বিশ্বের জনসংখ্যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০০ কোটিরও বেশি। এতো অধিক জনসংখ্যার বসবাস এবং সেটা ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির হার ভাবিয়ে তোলে রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানীদেরকে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘের সকল সদস্য দেশগুলো অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির পরিচালনা পরিষদ এই দিবসটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং প্রতিবছর ১১ই জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত হয়। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো পরিবার পরিকল্পনা, লিঙ্গসমতা, দারিদ্র্য, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য এবং মানবাধিকারের মতো জনসংখ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নানাবিধ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় পেঁৗছে দিয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি আশীর্বাদ না অভিশাপ উভয় দিক সম্পর্কে বাস্তবসম্মত জ্ঞান দান করা। ২০২৬ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস এর মূল প্রতিপাদ্য “ তরুণদের আশা ও আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া — আজ এবং ভবিষ্যতের জন্য “। এইবার তরুণ সমাজকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তারা নিজেদের এবং সমাজের জন্য সুন্দর ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, প্রজনন অধিকার এবং যুগোপযোগী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
১৯৮৭ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৫০০ কোটির বেশি, আজ মাত্র প্রায় চল্লিশ বছর পর ২০২৬ সালে সেই জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৩০ কোটির কমবেশি। অতি দ্রুত অধিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে জাতিসংঘ, সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের। বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারত, তারপরেই রয়েছে চীন। জরিপ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে বর্তমানে পৃথিবীতে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার ০.৮৩%। আমাদের দেশেও পিছিয়ে নেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির চক্র থেকে। দেশগুলোর মাঝে সীমানা প্রাচীরবিহীন এই পৃথিবীর আয়তন বাড়ছে না, কিন্তু বাড়ছে জনসংখ্যা। ভৌগোলিক আয়তন অনুযায়ী প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাসরত জনসংখ্যার হিসাব তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি কোনো দেশের ক্ষেত্রে আশীর্বাদ আবার অনেক দেশের জন্য অভিশাপ। আশীর্বাদের বিষয়ে আলোকপাত করলে বলতে হয় দেশে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ, ক্ষমতাসীনদের মাঝে থাকবে সততা, দূরদর্শিতা, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও মৌলিক চাহিদা পুরোন এর অঙ্গিকার। এমন সরকারের পক্ষেই সম্ভব শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করে দক্ষ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদে পরিণত করা। সব ধরনের মানুষের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী শক্তিতে সর্বস্তরের মানুষের ভূমিকা রাখা। জনসম্পদ দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি এই সহজসরল সত্য কথাটা মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দেওয়া। পৃথিবীর বুকে জনসংখ্যা কে জনসম্পদে রূপান্তর করা দেশের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি ও ইন্ডিয়া।
আবার এই জনসংখ্যা অনেক দেশেই অভিশাপ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় রাজনীতির নামে নৈরাজ্য, ঘুষ, দুর্নীতি, সরকারের দূরদর্শিতার অভাবে সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা না থাকায় মানুষের মৌলিক চাহিদা থাকে অপূর্ণ। স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নেই, জীবন সংগ্রামে লড়াকু সৈনিক হারিয়ে ফেলে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। একমাত্র সেখানেই অধিক জনসংখ্যা অভিশাপ বলেই ধরে নেওয়া হয়। যদি কোনো দেশ তাদের জনসংখ্যাকে শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মানবসম্পদে পরিনত করতে না পারে তবে সেই দেশের জন্য অভিশাপ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একটা সময় ব্যর্থ রাষ্ট্র, তলাবিহীন ঝুড়ি ইত্যাদি নানান বিশেষণে বিশেষিত হতো বিশ্ব দরবারে। আজ গর্বের সাথেই বলতে হয় সেই দিন আর নেই। অনেকদূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। তৈরি হয়েছে শিল্পকারখানা, বেড়েছে কর্মক্ষেত্র। বেকারত্বের অভিশাপ অবশ্যই আছে কিন্তু সেটা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে তার জন্য দরকার প্রচুর কর্মক্ষেত্র। পোশাক শিল্প অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম শক্তি কিন্তু মাঝে মধ্যে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা প্রশ্নবিদ্ধ করছে এই শিল্পকে। বিদেশে শ্রমিক রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বিশাল ভূমিকা রাখছে দেশের অর্থনীতিতে। তাই দক্ষ ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শ্রমিক রপ্তানিতে গুরুত্ব দিতে হবে। জনসংখ্যা অভিশাপের তালিকায় রয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নাইজেরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, কঙ্গো ও ইথিওপিয়ান। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে আমরা এই আশায় আশান্বিত হই সকল দেশের সকল জনসংখ্যা আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য হউক পৃথিবীর বুকে— সফল ও স্বার্থক হোক বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস।
লেখক :
শাব্বীর পল্লব
গবেষক ও প্রাবন্ধিক
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/175927