ভূগর্ভস্থ পানির সংকট: আমাদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ

ভূগর্ভস্থ পানির সংকট: আমাদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ

ভূগর্ভস্থ পানি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ, যা কৃষি, শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিরিক্ত ব্যবহার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষত শহরগুলোতে প্রায় ৭০ শতাংশ পানির চাহিদা ভূগর্ভস্থ পানি দিয়েই মেটানো হয়। কিন্তু, এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে এই অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হারে পানি উত্তোলন চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০০ থেকে ১৫০ মিটার নিচে নেমে যেতে পারে, যা ভয়াবহ পরিবেশগত ও সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। 

ভূগর্ভস্থ পানি সংকটের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন। নগরায়ণের ফলে বিভিন্ন শহরের মাটির নিচে অবস্থিত পানি কমে যাচ্ছে, কারণ বৃষ্টির পানি এখন আর আগের মতো ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারছে না। অপরিকল্পিত নির্মাণ ও কংক্রিটের অবকাঠামোর কারণে পানি শোষণের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। দেশের বহু অঞ্চলে কৃষিকাজ পরিচালনার জন্য গভীর নলকূপের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে পানির স্তর দ্রুত নিচে নামছে। শিল্পকারখানার অসচেতনভাবে পানি উত্তোলনও এ সংকটের অন্যতম কারণ। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত ও সামাজিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রথমত, কৃষির ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। পানি কমে যাওয়ায় অনেক স্থানে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে কৃষি জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সুপেয় পানির অভাব তীব্রতর হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে পানির স্তর নিচে নামার ফলে গভীর নলকূপের সাহায্যেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না, যার ফলে মানুষ বিশুদ্ধ পানির জন্য বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। 

এ সংকট শুধু পানির স্বল্পতাই নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্য, বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশের জন্যও মারাত্মক হুমকি। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, পানির স্তর কমে গেলে ভূমিধসের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে, ভূগর্ভস্থ পানি কমে যাওয়ার ফলে এর মধ্যে বিভিন্ন ক্ষতিকর ধাতু ও দূষিত পদার্থের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই আর্সেনিক দূষণের কারণে বহু মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। পানির স্তর আরও কমে গেলে আর্সেনিক দূষণের মাত্রা আরও বাড়বে, যা ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের কারণ হতে পারে। 

ভূগর্ভস্থ পানির এই সংকট মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহারে জোর দিতে হবে। বর্তমানে আমাদের দেশের অধিকাংশ নদ-নদী দখল, দূষণ ও নাব্যতা সংকটের কারণে পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত হবে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং পানির যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দ্বিতীয়ত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের শহরগুলোতে ছাদে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। অনেক দেশে ইতোমধ্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, আমাদেরও এই ধরনের নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। 

শিল্প ও কৃষি খাতে পানির অপচয় কমানোও অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশে প্রচলিত সেচ পদ্ধতিতে ব্যাপক পানি অপচয় হয়, যা ভূগর্ভস্থ পানির সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ড্রিপ ইরিগেশন বা স্প্রিংকলার প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কৃষিতে পানির ব্যবহার কমানো সম্ভব। পাশাপাশি, শিল্পকারখানায় পানির পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ অনেকটাই কমানো যাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে কড়া নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করতে না পারে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে পানি অপচয় করি, যার ফলে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি, সরকারকে অবশ্যই পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি উত্তোলন বন্ধ করতে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

 ভূগর্ভস্থ পানির সংকট শুধু একটি সাময়িক সমস্যা নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এখনই যদি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে সুপেয় পানির অভাব ভয়াবহ রূপ নেবে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে, খাদ্য সংকট দেখা দেবে, শিল্পখাত বিপর্যস্ত হবে এবং জনস্বাস্থ্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে, আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য এখনই যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বিলম্ব হলে সংকট আরও তীব্র হবে, যা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে যাবে। এ কারণে, সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে পানির টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পানি সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিতে হবে। প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতেই হবে। তাই এখনই সময়, আমাদের সকলকে এই সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে, তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

লেখক :

মিথিলা খাতুন

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,  
সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/175469