মায়ের মৃত্যুর ১২ বছর পর পিতৃপরিচয় পেল ধর্ষণে জন্ম নেওয়া সন্তান
মা নেই ১২ বছর। জন্মের পর থেকেই বাবার পরিচয়হীন এক জীবন। সমাজের তিরস্কার, অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মধ্যেই বড় হয়ে উঠেছে সে। অবশেষে ১৩ বছর পর আদালতের এক রায়ে মিলেছে তার পিতৃপরিচয়, সামাজিক স্বীকৃতি এবং আইনগত অধিকার। একই সঙ্গে ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন অভিযুক্ত হেলাল।
আজ বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে নেত্রকোণা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ড. এমদাদুল হক বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আসামি হেলালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আদালত ডিএনএ পরীক্ষার ভিত্তিতে নিশ্চিত করেন, ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া কন্যাশিশুটির জৈবিক পিতা হেলাল। ফলে শিশুটি এখন আইনগতভাবে তার বৈধ সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পিতার সম্পত্তিসহ সব ধরনের আইনগত অধিকারের দাবিদার হবে।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১ মার্চ রাতে নেত্রকোণার বারহাট্টা উপজেলার নিজ বাড়িতে তালাকপ্রাপ্ত এক নারীকে ধর্ষণ করেন হেলাল। ঘটনা প্রকাশ করলে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। পরে ওই বছরের ১৩ জুলাই বারহাট্টা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে ১১ অক্টোবর পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
ধর্ষণের শিকার নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ ও বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও হেলাল ধর্ষণের ঘটনা যেমন অস্বীকার করেন, তেমনি গর্ভের সন্তানের পিতৃত্বও প্রত্যাখ্যান করেন।
পরে আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, শিশুটির জৈবিক পিতা হেলালই।
তবে মামলার বিচার শেষ হওয়ার আগেই নেমে আসে আরেকটি নির্মম অধ্যায়। অভিযোগ দায়েরের প্রায় এক বছর পর স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন ধর্ষণের শিকার সেই নারী। মায়ের স্নেহ হারিয়ে ছোট্ট মেয়েটি আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় বড় হতে থাকে। পরিচয়হীনতার ভার বয়ে, সমাজের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে, আদালতের বারান্দায় কাটে তার শৈশবের অনেকটা সময়।
আজ সে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। কিন্তু এই বয়সেই তাকে লড়তে হয়েছে নিজের অস্তিত্ব, পরিচয় ও ন্যায্য অধিকারের জন্য। অবশেষে ১৩ বছরের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আদালত তাকে শুধু একজন বাবার নামই দেয়নি, ফিরিয়ে দিয়েছে তার আইনগত অধিকার ও সামাজিক স্বীকৃতিও।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. নুরুল কবীর রুবেল বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুটির পিতৃত্ব নিশ্চিত হয়েছে। ফলে সে হেলালের আইনগত সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং পিতার সম্পত্তিসহ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সব ধরনের অধিকার ভোগ করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে শুধু একজন ধর্ষকের শাস্তিই নিশ্চিত হয়নি, বরং নিরপরাধ একটি শিশু তার প্রাপ্য পরিচয় ও অধিকার ফিরে পেয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আদালত ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় হেলালকে দোষী সাব্যস্ত করেন। মামলায় ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, ডিএনএ প্রতিবেদন এবং অন্যান্য নথিপত্র পর্যালোচনা করে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এই দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
১৩ বছর আগে এক নারীর জীবনে নেমে এসেছিল ভয়াবহ নির্যাতনের অন্ধকার। সেই নারী আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু তার রেখে যাওয়া মেয়েটির জন্য আদালতের এই রায় যেন শুধু বিচার নয় একটি পরিচয়ের স্বীকৃতি, একটি শিশুর মর্যাদা ফিরে পাওয়ার গল্প এবং ন্যায়বিচারের এক মানবিক দৃষ্টান্ত।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/175443