ফুসফুস ক্যান্সারের কারণ ও চিকিৎসা
ফুসফুস ক্যান্সার হল এমন একটি রোগ, যেখানে ফুসফুসের কোষগুলির অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি শুরু হয়। এই অস্বাভাবিক কোষগুলি একত্রিত হয়ে একটি পিন্ড বা টিউমার তৈরি করে। এই টিউমারটি আশেপাশের টিস্যু ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আক্রমণ করতে পারে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে (মেটাস্ট্যাসিস) ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ফুসফুসের ক্যান্সার প্রধানত দুই প্রকার: ছোট কোষের ফুসফুসের ক্যান্সার। এটি কম সাধারণ হলেও দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ছড়িয়ে পড়ে। নন-স্মল-সেল ফুসফুসের ক্যান্সার। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় (প্রায় ৮৫% ক্ষেত্রে)।
ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকিসমূহ ঃ
ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো:
সক্রিয় ধূমপান: এটি ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রধানতম কারণ, প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে ধূমপান দায়ী। সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ ফুসফুসের কোষগুলিকে ক্ষতি করে এবং ক্যান্সার কোষ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে।
সেকেন্ডহ্যান্ড ধোঁয়া বা পরোক্ষ ধূমপান : যারা নিজে ধূমপান করেন না কিন্তু ধূমপায়ীর কাছাকাছি থাকার কারণে ধোঁয়া শ্বাস নেন, তাদেরও ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
পরিবেশগত উপাদান ঃ
রেডন গ্যাস : এটি একটি প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় গ্যাস যা মাটি ও পাথর থেকে নির্গত হয় এবং বাড়ি বা ভবনের ভেতরে জমা হতে পারে। ধূমপানের পরে এটি ফুসফুসের ক্যান্সারের দ্বিতীয় প্রধান কারণ।
অ্যাসবেস্টস ও অন্যান্য রাসায়নিকের সংস্পর্শ: কর্মক্ষেত্রে আর্সেনিক, অ্যাসবেস্টস, ক্রোমিয়াম, নিকেল বা কিছু পেট্রোলিয়াম পণ্যের মতো কার্সিনোজেনিক (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী) পদার্থের দীর্ঘমেয়াদী সংস্পর্শ ঝুঁকি বাড়ায়।
পূর্বের অসুস্থতা ও চিকিৎসাঃ
ফুসফুসের পূর্ববর্তী রোগ: দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের প্রদাহ, যেমন ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস বা অ্যাজমার মতো কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি সামান্য বাড়াতে পারে।
বিকিরণ থেরাপি : পূর্বে অন্য কোনো ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য বুকে বিকিরণ (রেডিয়েশন) থেরাপি নেওয়া থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বংশগত ইতিহাস : ফুসফুসের ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সামান্য বেশি থাকে, যা জেনেটিক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
ফুসফুস ক্যান্সারের লক্ষণসমূহঃ ফুসফুস ক্যান্সার বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এর লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ কাশি বা শ্বাসকষ্টের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়, যার ফলে রোগটি শনাক্ত করতে দেরি হয়।
ফুসফুস ক্যান্সারের লক্ষণগুলো সাধারণত রোগটি কিছুটা ছড়িয়ে পড়ার পর প্রকাশ পায়। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে
দ্রুত সতর্ক হওয়া প্রয়োজনঃ
দীর্ঘস্থায়ী কাশি: এমন কাশি যা তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে থাকে এবং ওষুধেও সারে না।
কাশি বা থুতুর সাথে রক্ত: কাশির সাথে রক্ত আসা বা খয়েরি রঙের থুতু নির্গত হওয়া।
শ্বাসকষ্ট: হঠাৎ করে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া।
বুকে ব্যথা: হাসলে, কাশলে বা গভীর শ্বাস নিলে বুকের ভেতর ধারালো ব্যথা অনুভব করা।
গলা বসে যাওয়া: দীর্ঘ সময় ধরে গলার স্বর ভাঙা থাকা।
ওজন ও ক্ষুধা কমে যাওয়া: কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে যাওয়া এবং খাবারের প্রতি অরুচি।
অব্যাহত ক্লান্তি: পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও শরীরে প্রচন্ড দুর্বলতা অনুভব করা।
বারবার সংক্রমণ: ঘনঘন নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হওয়া।
ফুসফুস ক্যান্সার শনাক্তকরণ কিভাবে ঃ ফুসফুস ক্যান্সার শনাক্ত করার জন্য সাধারণত বিভিন্ন
ধরনের পরীক্ষা করা হয়। কারণ, ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলি প্রায়শই অন্যান্য সাধারণ শ্বাসযন্ত্রের রোগের মতো হয়।
ফুসফুস ক্যান্সার শনাক্তকরণের প্রধান ধাপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
বুকের এক্স-রে : এটি প্রথম এবং সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা, যা ফুসফুসে কোনো অস্বাভাবিক পিন্ড (টিউমার) বা তরল জমা হয়েছে কি না তা দেখতে সাহায্য করে। তবে ছোট আকারের টিউমার বা অন্যান্য সমস্যার কারণে এটি অনেক সময় ক্যান্সার নিশ্চিত করতে পারে না।
সিটি স্ক্যান : এক্স-রের চেয়ে এটি অনেক বেশি বিস্তারিত ছবি তৈরি করে। এটি ফুসফুসের সন্দেহজনক এলাকাগুলির আরও পরিষ্কার চিত্র দেয় এবং ছোট টিউমার সনাক্ত করতে, লিম্ফ নোডে ক্যান্সার ছড়িয়েছে কি না তা দেখতে এবং ক্যান্সারের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে সহায়তা করে।
কম-ডোজ সিটি স্ক্যান : এটি হলো স্ক্রিনিং পদ্ধতি যা উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা (যেমন দীর্ঘদিনের ধূমপায়ী) ব্যক্তিদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই ক্যান্সার শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।
পিইটি-সিটি স্ক্যান : এই স্ক্যান ক্যান্সারের কোষের বিপাকীয় কার্যকলাপ দেখতে সাহায্য করে। একটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ (ট্রেসার) ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়, যা সক্রিয় ক্যান্সার কোষগুলিতে জমা হয়। এটি ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে কি না, তা নির্ণয় করতেও সহায়ক।
নিশ্চিতকরণের জন্য বায়োপসিঃ ইমেজিং পরীক্ষায় ক্যান্সার সন্দেহ হলে, বায়োপসি হল নির্ণয়ের একমাত্র নিশ্চিত পদ্ধতি। বায়োপসিতে ফুসফুস বা সন্দেহজনক এলাকা থেকে টিস্যু বা তরলের একটি নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং তা মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করে ক্যান্সার কোষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
ফুসফুস ক্যান্সারের চিকিৎসা পদ্ধতিসমূহঃ
ফুসফুস ক্যান্সারের চিকিৎসা পদ্ধতিসমূহ রোগের ধরন এবং পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে। চিকিৎসকগণ সাধারণত একাধিক পদ্ধতির সমন্বয়ে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন।
সার্জারি ঃ ক্যান্সারযুক্ত টিস্যু বা ফুসফুসের অংশ অপসারণ করা হয়। সাধারণত প্রাথমিক পর্যায়ে নন-স্মল সেল ফুসফুস ক্যান্সারের জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।
টিউমার এবং এর চারপাশে সামান্য কিছু স্বাভাবিক টিস্যু বাদ দেওয়া। ফুসফুসের তুলনামূলকভাবে বড় একটি অংশ অপসারণ করা। ফুসফুসের একটি সম্পূর্ণ লোব (খন্ড) অপসারণ করা। এটি সবচেয়ে প্রচলিত অস্ত্রোপচার। পুরো একটি ফুসফুস অপসারণ করা।
রেডিয়েশন থেরাপি ঃ উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন রশ্মি (যেমন এক্স-রে বা প্রোটন) ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করা হয়। শরীরের বাইরে একটি মেশিন থেকে রশ্মি প্রয়োগ করা। উচ্চ মাত্রার রেডিয়েশন সুনির্দিষ্টভাবে টিউমারে প্রয়োগ করা হয়।
কেমোথেরাপি ঃ ক্যান্সার কোষকে মেরে ফেলার জন্য ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এটি ট্যাবলেট আকারে বা শিরায় (ওঠ) দেওয়া যেতে পারে। স্মল সেল ফুসফুস ক্যান্সারের জন্য এটি প্রায়শই প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
টার্গেটেড থেরাপি ঃ এই ওষুধগুলি ক্যান্সার কোষের নির্দিষ্ট পরিবর্তন (মিউটেশন) বা দুর্বলতা লক্ষ্য করে কাজ করে, যার ফলে স্বাভাবিক কোষের ক্ষতি কম হয়। এই চিকিৎসার আগে রোগীকে পরীক্ষা করে দেখতে হয় তার ক্যান্সার কোষে এমন কোনো মিউটেশন আছে কিনা।
ইমিউনোথেরাপি ঃ এই পদ্ধতিতে শরীরের নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তোলা হয়, যাতে তারা ক্যান্সার কোষকে চিনতে ও আক্রমণ করতে পারে। এটি উন্নত পর্যায়ের ফুসফুস ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন আশা জুগিয়েছে।
উপশমকারী চিকিৎসা ঃ এটি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যা ক্যান্সারের কারণে সৃষ্ট ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে সাহায্য করে, রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করার দিকে মনোযোগ দেয়।
মনে রাখবেন: আপনার জন্য কোন চিকিৎসাটি সবচেয়ে উপযুক্ত, তা জানতে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের (যেমন একজন অনকোলজিস্ট) সাথে পরামর্শ করা অত্যাবশ্যক। ক্যান্সার ও চিকিৎসার পর্যায়, রোগীর সার্বিক স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/175309