অবহেলিত উত্তরাঞ্চলে এবার উন্নয়নের ছোঁয়া লাগবে
স্বাধীনতা উত্তরোত্তর দীর্ঘ প্রায় পঁচান্ন বছরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় যমুনা পার হয়ে উত্তরের জেলাগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ জেলা উন্নয়নের দিক থেকে অবহেলিত। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতীয় পার্টি সরকারও বেশিভাগ সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র সরকার দেশ পরিচালনা করে। এক এগারোর পরে দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। এই লম্বা সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের কোন জেলাতে আশাতীত উন্নয়ন ঘটেনি। এমনকি পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলা ছিল বরাবরের মতো অবহেলিত। স্বৈরাচার এরশাদ জাতীয়পার্টি সরকার গঠনের পর জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের বিল্ডিংসহ কোট কাচারীর উন্নয়ন বাস্তবায়ন হয়েছিল। কিন্তু গোটা দেশে সার্বিক উন্নয়নে রূপকার ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতার ঘোষক মরহুম জনাব জিয়াউর রহমান। তাঁর জীবদ্দশায় এবং পরবর্তীতে বিএনপি’ ক্ষমতাকালে উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় দৃশ্যমান বেশ কিছু উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছিল। কিন্তু এক এগারোর পরে শেখ হাসিনা সরকার দীর্ঘ ১৭ বছরে উত্তরাঞ্চলের গ্রেটার বগুড়া, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড় জেলার উন্নয়নে অনেকটাই ভাটা পড়ে ছিল। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনে হাজারো প্রাণের বিনিময়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়। গত ২০২৬ সালে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও বিএনপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। এবার হয়তো সমতার ভিত্তিতে উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত জেলাগুলোর সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি, পঞ্চগড় জেলার অহংকার দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, লেখক তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুরের গর্বের প্রতীক বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট জনাব আলহাজ্ব ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দীন সরকারকে, আটোয়ারী উপজেলার কৃতীসন্তান মরহুম জনাব মির্জা গোলাম হাফিজকে, পঞ্চগড়ের আরেক কৃতীসন্তান মরহুম জনাব গমীর উদ্দীন প্রধানসহ পঞ্চগড়ের উন্নয়নের কান্ডারী হিসেবে পরিচিত শিক্ষানুরাগী, রাজনৈতিক ও সমাজসেবক ব্যক্তিবর্গকে। যাঁদের হাত ধরেই আজকে পঞ্চগড় জেলার নানামুখী উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে। কিন্তু দেশের সর্বোত্তরের জেলা পঞ্চগড়বাসীর এখনো অনেক চাওয়া-পাওয়া বাকি রয়েছে। জেলাবাসীর এই চাওয়া-পাওয়া দাবিগুলো কয়েক যুগ ধরে। কিন্তু এর মাঝে একাধিক সরকারের ক্ষমতার রদবদল হলেও দাবিগুলোর প্রতি কারো নজর পড়েনি এটা দুঃখজনক। আমরা যখন দেখি, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ জেলায় বা পাশাপাশি দুটো জেলার মধ্যে কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট ও মেডিকেল কলেজ নেই। এছাড়া অনেক জেলা ও উপজেলার সংগে রেলপথ যোগাযোগ নেই। এশিয়ান হাইওয়ে সড়ক হওয়ার পরও মালিক সমিতি প্রায় জেলাতে ডে কোচ ও দূর পাল্লার বিআরটিসি বাস সার্ভিস চলাচল করতে দেয় না। যে কারণে অবহেলিত উত্তরাঞ্চলবাসীর কাছে উন্নয়নের বৈষম্য দৃশ্যমান।
সেই দিক থেকে দেখলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় আছে। পাশের জেলা দিনাজপুরে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এছাড়া রংপুরের পার্শ¦বর্তী জেলা নীলফামারীতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আছে ও ইপিজেট কারখানাও আছে। অপরদিকে কুড়িগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কাজ চলমান। লালমনিরহাটে রেল জংশন আছে এবং বিমানবন্দর চালু হওয়ার পথে। এরপরও বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতীম দেশ চীন বিশ্বমানের ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল বাস্তবায়নের নীলফামারীকে নির্বাচন করেছে। পার্শ্ববর্তী দুটি জেলা রংপুর ও দিনাজপুরে এবং নীলফামারীতেও মেডিকেল কলেজ আছে। তখন এজেলায় চীনের হাসপাতাল স্থাপন কতটা যৌক্তিক? এখানেই দূর্ভাগ্য পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলাবাসীর। কারণ এই দু’জেলায় কোন পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ এখনো গড়ে উঠেনি। পঞ্চগড়ে জেলা পর্যায়ের সরকারি কলেজে এখনো মার্স্টার্স (স্নাতকোত্তর) শিক্ষা এবং উপজেলা পর্যায়ে সরকারি কলেজগুলো বিএ অর্নাস (সম্মান) শিক্ষা কোর্স চালু হয়নি। এছাড়া দেশের চতুর্দেশীয় বাণিজ্যিক স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন বাংলাবান্ধা স্থলবন্দও পর্যন্ত দূরপাল্লার কোন ডে কোচ ও বিআরটিসি বাস সার্ভিস এবং রেলপথ যোগাযোগ নেই। সরকারি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। একমাত্র সরকারি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান চিনিকল তাও বর্তমানে বন্ধ আছে। এছাড়া স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ভরসা পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতাল ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো আসবাবপত্র ও জনবলের অভাবে তা চালু হয়নি। আমাদের পঞ্চগড় জেলায় উপরোক্ত বিষয়গুলোর বড় অভাব বিদ্যমান। যে কারণে পঞ্চগড়বাসীর দাবী, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের। বাংলাবান্ধা পর্যন্ত রেলপথ যোগাযোগ ও দূর পাল্লার ডে কোচ ও বিআরটিসি বাস সার্ভিস অনতিবিলম্বে চালু করা হোক।
আমরা খুব আশাবাদী, পার্শ্ববর্তী জেলা ঠাকুরগাঁও থেকে মাননীয় এলজিআরডি মন্ত্রী মহোদয়কে পেয়েছি। যিনি বিগত ১৭ বছর নানান চড়াই-উৎরাই, দমন-পীড়ন সহ্য করে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের নানারকম লোভ-লালসা তাঁকে দমাতে পারেনি এমনকি বিএনপি’র আদর্শ থেকে চুল পরিমাণ সরাতে পারেনি। তিনি বিএনপি’র কান্ডারী হিসেবে আপোসহীন নেত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়া জেলে বন্দি এবং অসুস্থতার মাঝে বিদেশে অবস্থানরত বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান’র দিকনির্দেশনায় অত্যন্ত সুচারুভাবে দলের কার্যাবলি পরিচালনা করেছেন। আমাদের সৌভাগ্য যে তিনি পঞ্চগড় জেলার পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও জেলার কৃতীসন্তান। এছাড়া পঞ্চগড় জেলাবাসীর ভোটে নির্বাচিত প্রাণপ্রিয় দু’জন এমপি’র মাঝে একজন প্রতিমন্ত্রী পেয়েছি। অপরদিকে বিরোধীদলীয় জোট থেকে একজন মহিলা সংরক্ষিত এমপি পেয়েছি। দু’জন সরকার দলীয় এবং একজন বিরোধীয় দলীয় সংরক্ষিত এমপি মিলে যৌথভাবে পঞ্চগড় জেলার দাবীগুলো পূরণের নিমিত্তে যথাযথভাবে সংসদে উপস্থাপন করার পাশাপাশি এলজিআরডি মন্ত্রী মহোদয়ের সহযোগিতায় সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করবে ইনশাল্লাহ। একই সংগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের ছোঁয়ার ভিত্তিতে উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত অন্যান্য জেলাসহ দেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
লেখক :
এম এ বাসেত
সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/175042