কৃষি উৎপাদন ও বিপণনে ন্যায্য মূল্যের প্রয়োজনীয়তা
একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় কৃষিকে। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষির সাথে যুক্ত। কৃষি মানুষের জীবনধারণ থেকে শুরু করে একটি দেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির মূল অংশ। কৃষি খাত কে বাদ দিয়ে একটি দেশের অর্থনীতি কল্পনা করা বেশ কঠিন। সমাজের কাঠামো গড়ে ওঠে কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ভিত্তিতে। কৃষিনির্ভর দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে কৃষকের ওপর, আর কৃষি নির্ভর করে কৃষকের শ্রম, চেষ্টা ও মেধার ওপর। ভাল ফসল উৎপাদনে কৃষকের ভূমিকা থাকে সবচেয়ে বেশি। তাই ভালো ফসল ফলা মানেই খাদ্যের উদ্বৃত্ত থেকে যাওয়া, আর উদ্বৃত্ত খাবার মানেই বাণিজ্যের নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হওয়া, এর ফলে গড়ে ওঠে বাণিজ্যকেন্দ্র। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তৈরি হয় নতুন নতুন পথ। এতে মানুষের মনোযোগ খাদ্য উৎপাদনের বাইরেও বেশ বিস্তৃত হয়। অবকাশ পায় নতুন নতুন চিন্তা, গবেষণা ও প্রযুক্তির দিকে মনোনিবেশ করতে। এরই ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় একটি অর্থনৈতিক শক্তিশালী রাষ্ট্র। তবে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন এ দু’য়ের মাঝে মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে বেশ প্রভেদ লক্ষ্য করা যায় আমাদের দেশে। কৃষক থেকে গ্রাহক পর্যায়ের মাঝে বৈষম্যের একটি সরল চিত্র প্রতিনিয়তই ফুটে উঠে। কৃষি এ দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি হলেও কৃষক সমাজ বরাবরের মতো অবহেলিত। ফসল উৎপাদনে কৃষকদের পড়তে হয় নানা সমস্যায়, যেমন- সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার ও কীটনাশক কিনতে হয়, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের বাজারদর তুলনামূলক কম।
অর্থাৎ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে চাষিরা ফসল উৎপাদনের আগ্রহ হারাচ্ছে, ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে বেশ প্রভাব পড়ছে। কয়েক বছরে সার-কীটনাশক, জ্বালানি তেল ও কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণে কৃষি খাতে বেশ প্রভাব পড়ছে। এদিকে সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে সারের কোনো সংকট নেই, গুদামে সার থাকলেও বাজার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত এক বস্তা সারের দাম ১ হাজার ২৫০ টাকা কিন্তু কৃষকদের কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪৫০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য সারের ক্ষেত্রেও ২০০ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। ফলে ফসল উৎপাদন পরবর্তী সময়ে কৃষকেরা বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। ফসল উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে অনেকাংশে কম দামেও বিক্রি করতে হয়। মাঠে উৎপাদিত ধান, পেঁয়াজ, আলু, মরিচ, বেগুন, টমেটো ইত্যাদি যে দরে বিক্রি করেন চাষিরা, তা সামান্য হাত বদলে গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছাতে দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য যখন সরাসরি বাজারে বিক্রি করা হয়, তখন নানা অজুহাতে তাদের কাছে থেকে তুলনামূলক কম দামে কেনা হয়। আবার পণ্য উৎপাদন খরচ বাড়লেও, বিক্রয় মূল্য তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণা অনুযায়ী, কৃষক বিক্রয় মূল্যের মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ পান, বাকিটা পাইকার, সংরক্ষণকারী ও সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যায়। কৃষি এ দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি হলেও কৃষক সমাজ বরাবরের মতোই অবহেলিত। বই থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সব জায়গায় কৃষকের অধিকারের কথা বলা হলেও, বাস্তবে তাঁরা সেই সম্মান বা মর্যাদা পান না। ঔপনিবেশিক শাসনামলে কৃষকদের শাসন, শোষণ ও নির্যাতন করা হতো। ফলশ্রুতিতে কৃষক সমাজ সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতো। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ নানা সংকট ও সমস্যা মোকাবেলা করে কৃষি উৎপাদনে বেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির ছোঁয়ায় দেশে কৃষিকাজ ও উৎপাদন সহজ হয়েছে। তবে এর পেছনে কৃষক সমাজ, উন্নত প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উৎপাদন বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
দেশের একপ্রান্তের মানুষের সাথে ওপর প্রান্তের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার ফলে কৃষি উৎপাদন ও বাজারজাত করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে। কৃষি উৎপাদন ও অর্থনীতি টেকসই করতে সবার আগে কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন। প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক ফসল উৎপাদন ও বাজারজাত করার পর যেন লাভবান হতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা বিশেষ প্রয়োজন। এতে তাঁরা ফসল উৎপাদনে বিশেষ আগ্রহী হবেন বলে আশা করা যায়। ফলশ্রুতিতে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সচ্ছল হবে, খাদ্যপণ্য রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। তাই দেশের কৃষি খাত উন্নয়ন ও আধুনিকরণ নিশ্চিত করা, নিয়মিত বাজার মনিটরিং, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করা বিশেষ প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, কৃষি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি আর কৃষক তার চালক। তাই ন্যায্য মূল্য পাওয়া কৃষকের অধিকার এবং ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করা সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
লেখক :
ইসমাইল হোসাইন
শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
ঢাকা কলেজ