হাসপাতালের দালালচক্র : চিকিৎসা যখন ব্যবসা

হাসপাতালের দালালচক্র : চিকিৎসা যখন ব্যবসা

হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির চোখে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য একটাই, তার প্রিয়জনকে বাঁচাতে হবে। হাতে হয়তো পরীক্ষার রিপোর্ট, পকেটে সীমিত টাকা, মাথায় হাজারো দুশ্চিন্তা। চিকিৎসক কী বলবেন, কত খরচ হবে, রোগী বাঁচবে কি না; এসব অনিশ্চয়তার মধ্যেই সে হাসপাতালের গেটে প্রবেশ করে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার পাশে এসে দাঁড়ায় আরেকটি ছায়া, ‘দালালচক্র’।

এই ছায়া কোনো একক ব্যক্তি নয়; এটি একটি ব্যবস্থা। একটি অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। একটি অদৃশ্য বাজার, যেখানে রোগী মানুষ নয়, একটি ক্লায়েন্ট; অসুস্থতা একটি সুযোগ; আর চিকিৎসা একটি পণ্য। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতাগুলোর একটি হলো হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র। এই চক্রকে অনেকেই কেবল কয়েকজন অসাধু ব্যক্তির কার্যক্রম বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং বাণিজ্যিক মানসিকতার সম্মিলিত ফল। একজন রোগী হাসপাতালে প্রবেশ করার আগেই তার চারপাশে তৈরি হয়ে যায় এক ধরনের বাজার। সেখানে রোগীকে কোন ক্লিনিকে পাঠানো হবে, কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করানো হবে, কোন অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হবে, কোন ওষুধ কেনা হবে; সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কমিশনের হিসাব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় রোগ নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এই চক্রের ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘রেফারেল’।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই ব্যবসা মানুষের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। একজন ব্যবসায়ী যখন কোনো পণ্য বিক্রি করেন, তখন ক্রেতার সামনে বিকল্প থাকে। কিন্তু একজন রোগীর সামনে সেই স্বাধীনতা অনেক সময় থাকে না। কারণ সে আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন এবং সময়ের চাপে থাকে। দালালচক্র ঠিক এই মানসিক অবস্থাকেই পুঁজি করে। তারা জানে, ভয় দেখানো সবচেয়ে কার্যকর বিপণন কৌশল। তাই বলা হয়, ‘এখানে চিকিৎসা ভালো হবে না’, ‘ডাক্তার পাবেন না’, ‘রোগীর অবস্থা খুব খারাপ’, ‘দ্রুত এই হাসপাতালে নিয়ে যান’, ‘এই টেস্ট এখনই করতে হবে।’ ফলে রোগী ও তার পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় তথ্যের ভিত্তিতে নয়, ভয়ের ভিত্তিতে। এই দালালচক্রকে বোঝার জন্য শুধু হাসপাতালের গেটের দিকে তাকালে হবে না; তাকাতে হবে পুরো স্বাস্থ্য অর্থনীতির দিকে। আজ স্বাস্থ্যসেবা এমন এক খাতে পরিণত হয়েছে, যেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। নতুন নতুন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি: সবকিছু মিলে একটি বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। বাজার থাকা অপরাধ নয়। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন মুনাফা মানবিকতার ওপর প্রাধান্য পায়। সবশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, একটি সভ্য সমাজে হাসপাতালের প্রকৃত পরিচয় কী? এটি কি এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষের দুর্বলতা বিক্রি হয়? নাকি এমন একটি আশ্রয়, যেখানে মানুষ জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে সহমর্মিতা খুঁজে পায়? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা চিকিৎসকদের নয়; এটি পুরো সমাজের কাছে নৈতিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন। কারণ হাসপাতালের দালালচক্র আসলে স্বাস্থ্যখাতের কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের আয়না। সেখানে আমরা দেখতে পাই, মানুষের অসুস্থতা থেকেও মুনাফা করার প্রবণতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে। 

যে সমাজে রোগীর কান্না কমিশনের অঙ্কে পরিণত হয়, যে সমাজে চিকিৎসা সেবা নয় বরং ব্যবসায়িক চুক্তিতে রূপ নেয়, সে সমাজের উন্নয়ন যতই হোক, তার মানবিকতা অপূর্ণ থেকে যায়। রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল উঁচু ভবন, বড় সড়ক বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে মাপা যায় না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন বোঝা যায় তার হাসপাতালের করিডোরে, সেখানে একজন অসহায় রোগী কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য সেবা পাচ্ছেন, তার মাধ্যমে। আর যতদিন হাসপাতালের গেটে দালাল দাঁড়িয়ে থাকবে, ততদিন আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ঝুলে থাকবে, আমরা কি সত্যিই চিকিৎসাকে সেবা হিসেবে দেখি, নাকি এটিকে কেবল আরেকটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছি?


লেখক :

আরিফুল ইসলাম রাফি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/174922