দুই মাসের আয়ে বারো মাস কাসুন্দিতে বদলাচ্ছে নারীদের জীবন
আবুল কালাম আজাদ বেড়া (পাবনা) থেকে : ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটার আগেই পাবনার বেড়া পৌর এলাকার মৈত্রবাঁধা মহল্লা জেগে ওঠে। চারপাশে ভেসে আসে ঢেঁকির ঠক ঠক শব্দ। কোথাও হাঁড়িতে পানি ফুটছে, কোথাও নারীরা বসে মশলা মিশাচ্ছেন। রোদ উঠতেই উঠান জুড়ে শুকাতে দেওয়া হয় রাই-সরিষাসহ নানা মশলা।
পুরো এলাকা যেন একসাথে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে এমন দৃশ্য শুধু শেখপাড়া মহল্লাতেই নয়, বেড়া উপজেলার মৈত্রবাঁধা, চরপাড়াসহ আরও কয়েকটি পাড়া-মহল্লাতেও দেখা যায়। আর এই পুরো আয়োজনের সাথে জড়িত প্রায় সবাই নারী। তাদের হাত ধরেই তৈরি হয় বাঙালির পরিচিত ও জনপ্রিয় খাবার কাসুন্দি। আর এই কাসুন্দি শুধু একটি খাবার নয়, বরং অনেক নারীর জীবিকা ও বেঁচে থাকার ভরসা। যদিও এই কাজের সময় মাত্র দুই থেকে তিন মাস। সরেজমিনে শেখপাড়া, মৈত্রবাঁধাসহ কয়েকটি কাসুন্দিগ্রাম ঘুরে দেখা যায়, সকাল হতেই বাড়িগুলোতে ভিড় বাড়ে।
কলস, ডেকচি নিয়ে পাইকারি ক্রেতারা আসেন কাসুন্দি কিনতে। বেশির ভাগই নারী। তারা কাসুন্দি কিনে আশপাশের গ্রাম, বাজার, এমনকি দূরের এলাকাতেও বিক্রি করতে যান। কেউ হেঁটে, কেউ ভ্যানে, কেউ বাসে। দিন শেষে তারা ফিরে আসেন হাতে কিছু টাকা নিয়ে। এই টাকাই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাইকারি দরে কাসুন্দি কিনে বিভিন্ন এলাকার বাড়িতে ও বাজারে ফেরি করে তা বিক্রি করেন শেখপাড়া মহল্লার নাদিরা বেগম (৫৫)। তিনি বলেন, প্রতিদিন ভোরে মৈত্রবাঁধার একটি বাড়ি থেকে পাইকারি দরে কাসুন্দি কিনে বের হই। সারাদিন দূর-দূরান্তের বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে কাসুন্দি বেচি। এতে দিনে চার-পাঁচশ’ টাকা লাভ থাকলে তা-ই আমাগরে জন্য অনেক।’
বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়েই চলে কাসুন্দির মৌসুম। বছরের এই মাত্র দুই মাসকে ঘিরেই বেড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের তিন শতাধিক নারীর সংসারে আসে বাড়তি আয়। এই সময়ে নারীরা মূলত দুইভাবে কাসুন্দির সাথে জড়িত থাকেন। একদল নারী বাড়ির সদস্য কিংবা কয়েকজন প্রতিবেশী মিলে দল গঠন করে কাসুন্দি তৈরি করেন। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এভাবে অন্তত ২৫ বাড়িতে চলে কাসুন্দি তৈরির কাজ। তৈরি করা কাসুন্দি তারা পাইকারি দরে বিক্রি করে দেন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। আর এই খুচরা বিক্রেতাদের বেশির ভাগই নারী। তারা কলস বা ডেকচিভর্তি কাসুন্দি কিনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, হাট-বাজার এমনকি আশপাশের উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। কাসুন্দি তৈরির সঙ্গে জড়িত নারীরা জানান, মৌসুমে একেকজনের ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। এই টাকা দিয়েই তারা বছরের বাকি সময়ের অনেক খরচ সামলান।
কেউ সন্তানের পড়াশোনার খরচ দেন, কেউ ঘর মেরামত করেন, কেউ ঋণ শোধ করেন। আবার অনেকে কিছু টাকা সঞ্চয়ও করেন। কাসুন্দি বানাতে লাগে রাই (সরিষা), জিরা, হলুদ, শুকনো মরিচ, ধনিয়া, তেজপাতাসহ নানা মশলা। প্রথমে এসব মশলা ভালো করে রোদে শুকানো হয়। তারপর ঢেঁকিতে বা মেশিনে আলাদা আলাদা করে গুঁড়ো করা হয়। এরপর ফুটানো গরম পানির সঙ্গে রাইয়ের গুঁড়ো মেশানো হয়। পরে তাতে লবণ আর অন্য মশলাগুলো পরিমাণমতো দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নেওয়া হয়। এইভাবেই তৈরি হয় কাসুন্দি- যার ঝাঁঝ আর স্বাদ বাঙালির খুব প্রিয়।
কাসুন্দি তৈরির পুরো কাজটাই সামলান নারীরা। নিজেরাই কাসুন্দি তৈরি করেন, বিক্রি করেন এবং টাকার হিসাব রাখেন। ফলে এই কাজ শুধু তাদের বাড়তি আয়ের সুযোগই তৈরি করেনি, অনেক নারীকে করেছে আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী। মৈত্রবাঁধা মহিলা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শিখা রাহা বলেন, কাসুন্দি তৈরি ও বিক্রির সাথে জড়িত বেশির ভাগ নারীই দরিদ্র। এই মৌসুমের আয়ের জন্য তারা সারাবছর অপেক্ষা করেন। কারণ, এই আয় তাদের সংসারে অনেকটা স্বস্তি এনে দেয়।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/174802