‘কিশোর গ্যাং’কে ফেরাতে হবে পারিবারিক আবহে

‘কিশোর গ্যাং’কে ফেরাতে হবে পারিবারিক আবহে

শৈশবের চাঞ্চল্যে মুখর কিশোররা এক সময়ে অপরাধ জগতে ‘কিশোর গ্যাং’ অভিধায় অভিযুক্ত হয়ে আমাদের ভাবিয়ে তুলবে-নব্বই সালের আগে এমন ধারণা আমাদের অনেকেরই ছিল না। প্রথম দিকে এ নিয়ে তেমন কেউ মাথাও ঘামায়নি। কিন্তু এখন পত্রপত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যাবে-১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী সেই কিশোররা নৈতিকতা  থেকে বিচ্যূত হয়ে ছোট-খাটো অপরাধ করতে করতে এখন সংঘবদ্ধ হয়ে দলবদ্ধভাবে কী সাংঘাতিকভাবেই না নিজেদের আধিপত্য বিস্তার, ইভটিজিং, জমিদখল, ধর্ষণ, চাকু, ছুরি দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, এমনকি খুনখারাবির মতো মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত করে চলেছে! ভাবা যায়? এই অপরাধ প্রবণতা এখন এতটাই বেড়েছে যে তাদের অত্যাচারে ভীষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সমাজের নানান শ্রেণির মানুষ। বলা হয়ে থাকে-অপ্রাপ্ত বয়সের এই কিশোরদের সামনে থাকে জীবন ও  জগৎ সম্পর্কে বিষ্ময় ও অতি কৌতুহল। অনেক সময় প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সেই কৌতূহল না মেটাতে পেরে দুঃখ-বেদনায়  অনেক কিশোর প্রচলিত মূল্যবোধ হারিয়ে নিয়মনীতি ভাঙ্গার এক ঝুঁকিপূর্ণ এ্যাডভেঞ্চারের দিকে ঝুঁকে পড়ে  ধীরে ধীরে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিককালে একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে বলা হয়- ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে বেড়িবাঁধ এলাকায় এক কিশোর গ্যাং ইমন নামের এক ছেলেকে কুপিয়ে পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করে দিলে হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। একই সময়ে রাজধানীর আদাবরে ফিল্মি স্টাইলে এক কুরিয়ার কর্মীকে কুপিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয় আরেকটি কিশোর গ্যাং। এর আগে ৩ এপ্রিল ঢাকার বাইরে কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়ে স্ত্রীকে ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় কিশোর গ্যাং এর হামলা ও ছুরিকাঘাতের শিকার হন এক দম্পতি। ৪ এপ্রিল নোয়াখালি সদর উপজেলায় ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের মারধরে নিহত হন বাবা সেলিম হোসেন। সারা দেশজুড়েই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঘটছে এ ধরনের মর্মস্পর্শী ঘটনা। এসবই প্রমাণ করে কিশোর অপরাধীরা এখন কতটা বেপরোয়া ও দুর্ধর্ষ। একটি জাতীয় দৈনিক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে-সারা দেশে ২৩৭টির মতো কিশোর গ্যাং বা গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১২৭টি গ্রুপ সক্রিয়। ২৪ সালে সরকার পতনের আগে ঢাকায় এসব গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৮২। এখন ঢাকার প্রতিটি থানা এলাকায় ৫০০ থেকে ১ হাজার সদস্য রয়েছে। আর চট্টগ্রামে রয়েছে ৫৭টি কিশোর গ্যাং, যার সদস্য ৩১৬।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন-মা বাবার মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিবাহবিচ্ছেদ, কিংবা অভিভাবকদের অতিরিক্ত ব্যস্ততার কারণে সন্তানদের ওপর থেকে নজরদারি কমে যাওয়ায় সন্তানরা সেই সুযোগে অনেক সময় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া নৈতিক মূল্যবোধের ঘাটতি এবং কম বয়সে আবেগতাড়িত হয়ে খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ভুল পথে ধাবিত হয়ে অজান্তেই কিশোর গ্যাংয়ের সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। বাবা মার অসচেতনতার কারণে সহজেই হাতে পাওয়া স্মার্টফোনের অপব্যবহার, ইন্টারনেটের মাধ্যমে অপরাধনির্ভর দেশি বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণও এ জন্য দায়ী। হতাশা, দরিদ্রতা, বস্তির ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ, কিছু বাহুল্য শখ পূরণের তাগিদে কিশোর গ্যাং এর সংখ্যা বাড়ছে। অভিজ্ঞমহল জানাচ্ছেন-সুস্থ বিনোদন ও সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব, পড়াশোনা ও কোচিংয়ের অত্যধিক চাপে পিষ্ট কিশোরদের অনেকেই এখন সুযোগ পেলেই গ্যাং কালচারে আকৃষ্ট হচ্ছে। অপরিণত বুদ্ধির কারণে হিরোইজম বা বড়ত্ব দেখানোর প্রবণতা, অসৎ সঙ্গ ও  স্বীকৃতির অভাবও কিশোরদের গ্যাংমুখী করে তুলছে। স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী ও সমাজবিরোধীরা বা স্থানীয় প্রভাবশালী বা অসাধু রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় বিপথগামী কিশোররা এ ধরনের আত্মঘাতী গ্যাংয়ে যুক্ত হয়ে পড়ছে। বলাই বাহুল্য, এ এক ভয়াবহ সামাজিক ক্ষত, যা একটি সভ্য জাতি হিসেবে আমাদের উদ্বিগ্ন  না করে পারে না। একে সমাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে রুখে দিতে হবে এখনি। আমাদের সন্তান ও জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার এসব কিশোরকে এই আত্মবিধ্বংসী পথ থেকে ফেরাতে হবে দ্রƒত। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এসব বিভ্রান্ত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পারিবারিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনা। পরিবারে অভিভাবকদের উচিত হবে-সন্তানের মানসিক ও আবেগীয় পরিবর্তনের দিকে খেয়াল রাখা,তাদের সময় দেওয়া, তাদের সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে যথা সম্ভব সমাধান করার চেষ্টা করা। তাদের কোনভাবেই অপরাধী হিসেবে গণ্য করে দূরে ঠেলে দেওয়া যাবে না। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে অভিভাবকদের। আর তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি  খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা করার সুযোগ করে দিতে হবে রাষ্ট্রকে। যারা ইতোমধ্যে কিশোর অপরাধে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাদের গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে আটক করতে সক্রিয় হতে হবে পুলিশকে। আঠারোর নিচে বয়সের কারণে তাদের শাস্তির আওতায় না আসার কথা। সেক্ষেত্রে কিশোর গ্যাং এর অপতৎপরতা রোধ করতে থানা পর্যায়ে থাকতে পারে বিশেষ একটি সেল,যেখানে থাকবে পথভ্রষ্ট কিশোরদের নেতিবাচক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত হওয়ার প্রবণতা থেকে ফিরিয়ে আনার কাউন্সিলিং বা সংশোধন করার মতো ব্যবস্থা। সবচেয়ে জরুরি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা উভয়েরই সমন্বিত প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা ও দরিদ্রদের বিধিবদ্ধ  আর্থিক সহায়তা প্রদান, যার মাধ্যমে আগামীর কর্ণধার এসব অবুঝ কিশোররা সঠিক পথের দিশা পেয়ে নিজেদের মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে জাতীয় উন্নয়ন ও  বিকাশে মূল্যবান অবদান রাখতে পারে। 

 

লেখকঃ 

রাহমান ওয়াহিদ

কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/174723