আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে 'আশুরা' বলা হয়। এটি বিশ্বের সকল মুসলমানের জন্য অপরিসীম আধ্যাত্মিক, ঐতিহাসিক ও আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।

আশুরার ঐতিহাসিক ধর্মীয় গুরুত্ব ও আমল:

* ঐতিহাসিক মুক্তি ও রহমত: এই দিনে আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের জুলুম থেকে হজরত মুসা (আ.) এবং বনি ইসরাইলকে লোহিত সাগর পার করে মুক্তি দিয়েছিলেন। এছাড়া হজরত নুহ (আ.)-এর নৌকা মহাপ্লাবনের পর জুদি পর্বতে নিরাপদে নোঙর করেছিল। * রোজা ও ইবাদতের ফজিলত: রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা বাধ্যতামূলক বা ফরজ ছিল। বর্তমানে এটি নফল ইবাদত হিসেবে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনে রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখতে উৎসাহিত করতেন। * আশুরার রোজা রাখা: আশুরার দিনের মূল ইবাদত হচ্ছে এ দিনের রোজা রাখা।  শরিয়তের দৃষ্টিতে আশুরার রোজা রাখা নফল। আবু কাতাদা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ( সা.) বলেছেন, আশুরার এক দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে এই আশা করি যে তিনি এ রোজার অসিলায় বান্দার আগের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন। (মুসলিম, হাদিস: ১,১৬২)। তবে তিনি আশুরার আগে বা পরে অন্তত আরো একটি রোজা রাখতে বলেছেন যাতে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য না হয়।


  • * বিধর্মীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করা: মহররমের দশম দিবসে ইহুদিরা রোজা রাখত। এজন্য রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো এবং তাতে ইহুদিদের বিরুদ্ধাচরণ করো। আশুরার আগে এক দিন বা পরে এক দিন রোজা রাখো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২,১৫৪)। এ ছাড়া এ মাসের শুরুর দিনটিকে তারা ঈদের মতো উদযাপন করত। রাসুল (সা.) তাদের সঙ্গে উদযাপন করতে নিষেধ করেছেন এবং মুসলিমদের দুটি ঈদÑঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, কিয়ামতের দিন সে ওই জাতির দলভুক্ত হবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪,০৩১)।
  • * তওবা-ইস্তিগফার করা: এটি যেকোনো সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। আশুরার সাথে তাওবা কবুল হওয়া, আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তি, নিরাপত্তা এবং গায়েবি মদদ লাভ করার ইতিহাস জুড়ে আছে। এজন্য এ সময়ে বিশেষভাবে তাওবা- ইস্তেগফার করা উচিত। রাসুলুল্লাহ ( সা.) বলেছেন, তুমি যদি রমজানের পর রোজা রাখতে চাও তাহলে মহররমের রোজা রাখো। কেননা মহররম হচ্ছে আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একদিন আছে, যেদিন আল্লাহ তায়ালা অতীতে অনেকের তাওবা কবুল করেছেন। ভবিষ্যতেও অনেকের তাওবা কবুল করবেন ( জামে তিরমিজি, হাদিস : ৭৪১)।
    * পরিবারের জন্য উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করা: রাসুলুল্লাহ ( সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারের জন্য ব্যয় বৃদ্ধি করবে, ভালো খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করবে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সারা বছরের প্রাচুর্য বাড়িয়ে দিবেন। হজরত সুফিয়ান ছাওরি ( রহ:) বলেন, আমরা এটি পরিক্ষা করেছি এবং এর যথার্থতা পেয়েছি ( ফয়জুল কালাম, হাদিস : ৫০১)।
  •  
  • কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা ও আত্মত্যাগ:  রাসুলুল্লাহ ( সা:) এর জামানা থেকে আশুরা দিবসটি মহান আল্লাহর রহমত লাভের দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। এজন্য শুকরিয়াস্বরূপ রোজা রাখা হয়। পরবর্তিতে হিজরি ৬১ সনে এ আশুরা দিবসের সাথে যুক্ত হয় এক করুণ, মর্মস্পর্শী ও বেদনাদায়ক ঘটনা। ৬১ হিজরি তথা ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে (১০ মহররম) কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবার সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে এই আত্মত্যাগ অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত না করার চিরন্তন শিক্ষা প্রদান করে। হজরত হুসাইন (রা.) আশুরার দিনে ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে অসত্য, অসুন্দর, অন্যায় ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে সত্য, সুন্দর, ন্যায় ও কল্যাণের জন্য আত্মোৎসর্গ করে অনন্তকালের জন্য আদর্শিক শিক্ষা এবং শক্তির ওপর সত্যের বিজয়ের চেতনা জাগ্রত করে গেছেন।

  • বর্জনীয় আমল: আলোকসজ্জা প্রদর্শন, তাজিয়া বানানো, শোক পালন করা, মাতাম করে বুক চাপড়ানো, পিঠে চাবুক দিয়ে আঘাত করা, শরীর রক্তাক্ত করা, শোক মিছিল বের করা, মর্সিয়া বা শোকগাঁথা পাঠ করা, আতশবাজি ফোটানো, বিশেষ খাবার বা শরবত বানিয়ে বিতরণ করা ইত্যাদি।

 

লেখক :

হাফেজ মাও: আজিজুল হক

প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/174059