বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর ভাঙনে ১শ”৪০ পরিবারের বসতভিটা বিলীন

বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর ভাঙনে ১শ”৪০ পরিবারের বসতভিটা বিলীন

সারিয়াকান্দি (বগুড়া) প্রতিনিধি : বগুড়ার সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নে যমুনা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙনে গত এক সপ্তাহে ১৪০ পরিবারের বসতভিটে যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে নতুন জেগে ওঠা চরে বা অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন এলাকাবাসী। ভাঙন কবলিত এলাকায় দ্রুত কাজ শুরু করা হবে কিনা তা পরিস্কার করেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং উপজেলা প্রশাসন ভাঙন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার আশ্বাস দিয়েছেন।

উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের চকরথিনাথ, ধনারপাড়া, করনজাপাড়া, শেরপুর, শিমুলবাড়ী, নয়াপাড়া, কর্ণিবাড়ী, দুব্বাগাড়ী এবং চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের সুজালিরপাড়া গ্রামে বিগত ২০১৫ সাল থেকেই যমুনা নদীর ভাঙন চলমান রয়েছে। হাটশেরপুর ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এ ইউনিয়নের বর্ণিত গ্রামগুলোর প্রায় ২ হাজার পরিবার যমুনা নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন। সাথে হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমি যমুনায় বিলীন হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রতিবছর ‘দৈনিক করতোয়া’সহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরেও এখানে যমুনা নদীর ভাঙন রোধে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে এসব গ্রামের মানুষ বারবার ভাঙনের শিকার হয়ে বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন করছেন। সর্বশেষ গত ১০ দিন আগে হাটশেরপুর ইউনিয়নের চকরথিনাথ এবং শেরপুর গ্রামে যমুনা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে।

ফলে এ গ্রামের মানুষরা দিশেহারা হয়ে তাদের ঘর-বাড়ি ভেঙে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ যমুনার জেগে ওঠা নতুন চরাঞ্চলে নতুন করে বসতি স্থাপন করছেন, কেউবা একেবারেই এলাকাছাড়া হচ্ছেন। গত কয়েক দিনে এসব গ্রামের ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের শিকার হয়েছে। এ গ্রামের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চকরথিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও ভাঙনের শিকার হয়েছে এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ক্রসবাঁধে বিদ্যালয়টির পাঠদান কোনরকম চালু রাখা হয়েছে।

গ্রামটিতে সরেজমিনে দেখা যায়, সেখানে সবসময়ই চলছে ঘর-বাড়ি ভাঙার আয়োজন। কেউবা যত্ন করে গড়ে তোলা বড়বড় গাছ কাটছেন, কেউবা নিজের ঘরের খুঁটি তুলছেন, কেউবা টিনের বেড়া টানতে ব্যস্ত রয়েছেন, কেউবা একত্রে দলবেঁধে ঘরের চালা কাঁধে করে নৌকায় তুলছেন। গ্রামের গৃহবধুরা এসব কাজে সহযোগিতা করছেন, কেউবা নিজের চুলোয় এ বাড়ির শেষ রান্না করছেন এবং চোখের পানি ফেলছেন জ্বলন্ত আগুনের ওপর।

কারণ, এ চুলাতে আর তার রান্না করা হবে না, এ বাড়ির উঠানেও আর তার থাকা হবে না। এ গ্রামের ৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেশকিছু মসজিদ ও বিভিন্ন সামাজিকপ্রতিষ্ঠানসহ প্রায় ৩শ’র বেশি পরিবারের বসতভিটে, কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি ভাঙন হুমকিতে রয়েছে।

কথা হয় চকরথিনাথ গ্রামের মৃত সুমের আলী শেখের ছেলে আব্দুল জলিল শেখের (৬৫) সাথে। তিনি বলেন, চকরথিনাথ চরেই ৪ বার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছি। গত ৭ বছর আগে এই চকরথিনাথ গ্রামের একেবারে শেষ সীমানায় শেরপুরে বাড়ি করেছিলাম। ৭ বছরে আমার বসতভিটায় বেশ বড়বড় গাছপালা হয়েছিল। বিদ্যুৎ সুবিধাও পেয়েছিলাম। কিন্তু যমুনা নদীর ভাঙনে এখানে আর থাকতে পারলাম না।

বাড়িঘর ভেঙে নতুন জেগে ওঠা চরের ধূ ধূ বালুচরে আবার নতুন করে বসতভিটে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। সরকার এতো জায়গায় নদী ভাঙনের কাজ করে কিন্তু আমাদের হাটশেরপুর ইউনিয়নে কেন কোনও কাজ করে না তা আমাদের বোধগম্য না।

হাটশেরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূর মো. মেহেদী হাসান আলো বলেন, গত ৭দিন আগে নদী ভাঙনের শিকার ১৪০টি পরিবারের তালিকা করেছি। এ তালিকা দ্রুত বাড়ছে, গত বুধবার পর্যন্ত ১৯৫টি পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে তাদের বসতভিটা হারিয়েছেন এবং বাড়ি-ঘর অন্যত্র স্থানান্তর করেছেন। দ্রুত যমুনা নদীর ভাঙনে কাজ শুরু করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এলাকাবাসীর পক্ষে জোর দাবি জানাচ্ছি। তবে এ বিষয়ে বগুড়া জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। তারা বলছে, গ্রামগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের বাইরে থাকায় বারবার প্রকল্প প্রস্তাব প্রেরণ করেও কোনও সুরাহা পাওয়া যাচ্ছে না।

সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, ইতিমধ্যেই ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ভাঙন কবলিত এলাকার প্রতিবেদন বগুড়া জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে সেখানে দ্রুত ভাঙন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

বগুড়া-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, হাটশেরপুর ইউনিয়নের যমুনা নদী ভাঙন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার প্রদান করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে খুব দ্রুত সেখানে ভাঙন মোকাবিলায় কাজ শুরু করা হবে। এ বিষয়ে ভাঙনের শিকার এলাকাবাসীর খোঁজখবর এবং তাদের সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখা হয়েছে।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173825