বগুড়ায় সময়ের দাবি আধুনিক শিল্পপার্ক : শত কোটি টাকার রপ্তানি বন্ধ, ঝুঁকির মুখে ৪ হাজার কারখানা
স্টাফ রিপোর্টার: দেশের বিভিন্ন জেলায় বগুড়ার হালকা প্রকৌশল (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং) ও কৃষি যন্ত্রপাতির বিপুল চাহিদা থাকলেও সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সম্ভাবনাময় এই খাতটি বিকশিত হতে পারছে না। উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় এখন একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত শিল্পপার্ক স্থাপন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবিতে পরিণত হয়েছে।
শিল্পের সাথে জড়িত স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রার মান বদলে দিতে বগুড়ায় একটি আধুনিক শিল্পপার্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। দেশের সামগ্রিক বার্ষিক চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই পূরণ করে বগুড়ার কারখানাগুলো, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এমনকি দেশের মোট সেচ পাম্পের ৭০ শতাংশই তৈরি হয় বগুড়ার ফাউন্ড্রি ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে।
১৯৯৫ সালে ভারতে সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প রপ্তানির মাধ্যমে এই খাতের আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতে পণ্য রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। একই সাথে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক বাজারে এই পণ্য রপ্তানি করা যায় কি না, তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এবং বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া জেলাজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪ হাজারের বেশি বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কারখানা সক্রিয় রয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে বৃহৎ শিল্প ১২০টি, মাঝারি শিল্প ১৯টি, ক্ষুদ্র শিল্প ২ হাজার ৩৫১টি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প রয়েছে ৭৪৫টি (যার মধ্যে রাইস মিল, অটো রাইস মিল, ফিড মিল, হিমাগার ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প অন্তর্ভুক্ত)।
এছাড়া হালকা প্রকৌশল ও ফাউন্ড্রি শিল্পের অধীনে খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির ওয়ার্কশপ রয়েছে প্রায় ৫০০টি, হালকা প্রকৌশল সামগ্রী তৈরির কারখানা প্রায় ৫০০টি এবং লোহা গলানো ও ছাঁচ তৈরির ‘ফাউন্ড্রি’ কারখানা রয়েছে ১২৪টি। এর বাইরেও প্লাস্টিক, বেকারি সামগ্রী, প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং, টেক্সটাইল এবং সুতা তৈরির বেশ কিছু মাঝারি ও বড় কারখানা গড়ে উঠেছে। কিন্তু একটি পরিকল্পিত আধুনিক শিল্পপার্কের অভাবে এই বিশাল শিল্প-কাঠামোকে একটি সুসংগঠিত ও প্রযুক্তিবান্ধব প্ল্যাটফর্মে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। এই অঞ্চলটি একাই দেশের মোট খাদ্য চাহিদার ৫০ শতাংশ এবং কৃষি-শিল্পের কাঁচামালের ৭০ শতাংশ জোগান দেয়। বগুড়ায় উৎপাদিত আলু, মরিচ ও ভুট্টা বর্তমানে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
পাশাপাশি শেরপুর ও কাহালু উপজেলার গ্রামীণ নারীদের তৈরি হস্তশিল্প পণ্য জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের ১৮টি দেশে এবং বিশেষ ধরনের পোশাক মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হচ্ছে। অথচ বগুড়ায় কোনো আধুনিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ (ফুড প্রসেসিং) শিল্পপার্ক না থাকায় কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না এবং প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পচনশীল কৃষিপণ্য নষ্ট হচ্ছে।
বর্তমানে বগুড়ায় ৫০০টি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ৫০০টি যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা এবং ১২৪টি ফাউন্ড্রি শিল্প অত্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি আধুনিক শিল্পপার্ক স্থাপন করে সেখানে ‘কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার’, পরীক্ষাগার, আধুনিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধন প্ল্যান্ট স্থাপন করা গেলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন দক্ষতা বহুগুণ বেড়ে যেত।
বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল মেশিনারিজ মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বামমা) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রাজেদুর রহমান রাজু জানান, বগুড়ায় প্রচুর উদ্যোক্তা রয়েছেন। আজ থেকে ১০-১২ বছর আগেও পাড়া-মহল্লার ঘরে ঘরে লেদ ওয়ার্কশপ ছিল। কিন্তু আবাসিক এলাকায় পরিবেশ দূষণের অজুহাতে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চিঠি দেওয়ার কারণে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাদের কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, একটি সুনির্দিষ্ট শিল্পপার্ক না থাকায় এই সম্ভাবনাময় খাতটি এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যে কোনো সময় বড় ধরনের ধস নামতে পারে। তাই বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের টেকসই বিকাশ এবং আবাসিক এলাকা থেকে কলকারখানাগুলো নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে এখনই একটি আধুনিক শিল্পপার্ক গড়ে তোলা জরুরি।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173662