এবার বিশ্বকাপে মাঠে বসে ম্যাচ দেখতে কত খরচ হচ্ছে, জানেন কি?

এবার বিশ্বকাপে মাঠে বসে ম্যাচ দেখতে কত খরচ হচ্ছে, জানেন কি?

রেকর্ড-ভাঙা টিকিট মূল্য এবং ভ্রমণ খরচের কারণে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপকে অনেকেই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্রীড়া আসর হিসেবে মনে করছেন। তবে খরচ যতই বেশি হোক, বিশ্বের নানা প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীরা স্টেডিয়ামে গিয়ে ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতাকে জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন হিসেবে বর্ণনা করছেন। বিভিন্ন দেশের দর্শকরা জানিয়েছেন তাদের বিশ্বকাপ যাত্রার বাস্তব অভিজ্ঞতা, যেখানে কারও জন্য এটি হানিমুনের অংশ, কেউ আবার বছরের সঞ্চয় ভেঙে স্বপ্নপূরণ করেছেন, আবার কেউ তুলনামূলক কম খরচে পরিকল্পনা করে ম্যাচ উপভোগ করেছেন।

এবারের ফিফা বিশ্বকাপ এখন কেবল মাঠের লড়াই নয়, বরং একেকজন দর্শকের জন্য হয়ে উঠেছে ব্যয়ের এক বড় পরীক্ষা। টিকিটের আকাশচুম্বী দাম, ভ্রমণ, হোটেল ও দৈনন্দিন খরচ মিলিয়ে একজন সাধারণ দর্শকের জন্য বিশ্বকাপ দেখা এখন আর শুধু আবেগ নয়, বরং একটি বড় আর্থিক পরিকল্পনার বিষয়। ফ্লাইটস্কোর ও বিভিন্ন দর্শকের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, একজন দর্শকের বিশ্বকাপ উপভোগের খরচ তার পরিকল্পনা, ম্যাচ সংখ্যা এবং শহরভেদে কয়েকগুণ পর্যন্ত পার্থক্য তৈরি করছে।

প্রথম রাউন্ডের ম্যাচগুলোর টিকিটের দাম সাধারণত ৩৫০ ডলার থেকে শুরু হয়ে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকার বেশি।

অর্থাৎ একজন দর্শক যদি একটি সাধারণ ক্যাটাগরির ম্যাচও দেখেন, শুধু টিকিটেই তাকে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, হোটেল, যাতায়াত ও খাবারের মতো অতিরিক্ত খরচ। ফলে পুরো সফর অনেক দর্শকের জন্য হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

শুরুর দিকে ধারণা করা হয়েছিল, এত উচ্চমূল্যের কারণে স্টেডিয়াম ফাঁকা থাকবে। তবে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার বিভিন্ন ভেন্যুতে গ্যালারি দর্শকে পূর্ণ দেখা গেছে। অনেকে সীমিত বাজেটেই পরিকল্পনা করে বিশ্বকাপ উপভোগ করেছেন, আবার কেউ খরচকে জীবনের অনন্য অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিমান ভাড়া। ইউরোপ বা এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা কিংবা মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ দেখতে আসতে একজন দর্শকের গড়ে প্রায় ১২০০ থেকে ২ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকা) পর্যন্ত বিমান ভাড়া পড়ছে।

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ভাড়া ওয়ান-ওয়ে বা একমুখী ভ্রমণের জন্য সাধারণত সর্বনিম্ন ৮০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং আসা-যাওয়া বা রিটার্ন টিকিটের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। একাধিক শহরে খেলা দেখতে গেলে এই খরচ আরও বাড়ছে।

১০ দিনের আনুমানিক খরচ

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একজন দর্শক যদি গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচ দেখার পরিকল্পনা করেন এবং ১০ দিন অবস্থান করেন, তাহলে তার মোট খরচ কয়েকটি ভাগে হয়।

বাংলাদেশ থেকে যদি কেউ বিশ্বকাপ দেখতে চান, তাহলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে একজনের গড়ে খরচ আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত দাঁড়ায়। হোটেল বা মাঝারি মানের আবাসনের জন্য ১০ দিনে আরও প্রায় ১ হাজার থেকে ৬ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৭ লাখ টাকা) পর্যন্ত খরচ পড়তে পারে। টুর্নামেন্ট উপলক্ষে আয়োজক শহরগুলোতে হোটেলের ভাড়া স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

এছাড়া গ্রুপ পর্বের ৩টি ম্যাচের অফিশিয়াল টিকিটের মোট মূল্য ক্যাটাগরি এবং ম্যাচের গুরুত্বভেদে সর্বনিম্ন ৪৫ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এর বাইরে স্টেডিয়ামে যাতায়াত, খাবার ও দৈনন্দিন খরচে আরও প্রায় ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

শহর ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী খরচের পার্থক্য

বিশ্বকাপে খরচ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। কেউ ফ্লাইট পয়েন্ট ও কম খরচের হোটেল ব্যবহার করে সফর শেষ করছেন, আবার কেউ প্রিমিয়াম টিকিট ও বিলাসবহুল হোটেলে কয়েক হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করছেন।

কিছু দর্শক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শুধু একটি প্রিমিয়াম ম্যাচ টিকিটের দামই ২ হাজার ৫০০ ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ টাকা) বেশি হয়েছে। আবার কেউ কেউ লটারিতে কম দামে টিকিট পেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক কম খরচে ম্যাচ উপভোগ করতে পেরেছেন।

অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের মতো সমর্থকরা পরিকল্পিতভাবে কম বাজেটে একাধিক শহর ঘুরে ম্যাচ দেখছেন, যেখানে ফ্লাইট পয়েন্ট, শেয়ারড হাউজিং এবং সাশ্রয়ী খাবার ব্যবহার করে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।

খরচ বাড়াচ্ছে ডাইনামিক প্রাইসিং

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের খরচ এত বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে টিকিটের দাম চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায়, ফলে একই ম্যাচের টিকিট একেক সময়ে একেক দামে বিক্রি হয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে গ্রুপ পর্বের ম্যাচের দামও ফাইনালের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে, যা সাধারণ দর্শকদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।

শুধু টিকিট নয়, পুরো ভ্রমণই ব্যয়বহুল

একজন দর্শকের জন্য খরচ কেবল টিকিটেই সীমাবদ্ধ নয়। স্টেডিয়ামের খাবার ও পানীয়, পার্কিং, রাইডশেয়ার, এমনকি ভিসা ফিও মোট ব্যয়ের বড় অংশ তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়ামগুলোতে খাবারের দাম সাধারণত ১০ থেকে ৩০ ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা) মধ্যে থাকে। পার্কিং ফি অনেক জায়গায় ১০০ থেকে ৩০০ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা) পর্যন্ত পৌঁছায়। আবার আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য ভিসা ফি গড়ে প্রায় ১৮৫ ডলার।

সব মিলিয়ে একজন দর্শকের ১০ দিনের বিশ্বকাপ সফরের মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ টাকা থেকে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত। এর ফলে এবারের বিশ্বকাপকে অনেকেই ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্রীড়া আসর হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে এত খরচ সত্ত্বেও ফুটবলপ্রেমীদের মতে, স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ দেখা এখনো জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা, যার সঙ্গে আর্থিক হিসাব পুরোপুরি মেলানো যায় না।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173634