পলাশী দিবস উপলক্ষে ঢাবি ছাত্রশিবিরের ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

পলাশী দিবস উপলক্ষে ঢাবি ছাত্রশিবিরের ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

ঢাবি প্রতিনিধি: ঐতিহাসিক পলাশী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে “পলাশী থেকে বাংলাদেশ: সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও আজাদির সংগ্রামের সিলসিলা” শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৩জুন ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের অডিটোরিয়ামে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন। বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন বিশিষ্ট গবেষক ও প্রাবন্ধিক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি কাজী আশিক।

প্রধান আলোচক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন তাঁর বক্তব্যে পলাশীর বিপর্যয়ের ঐতিহাসিক কারণ এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, দূরদর্শিতার অভাব, প্রজ্ঞার ঘাটতি এবং জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিস্বার্থকে স্থান দেওয়ার কারণেই সেদিন বিদেশি ষড়যন্ত্রের পথ সুগম হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলার শিক্ষা, সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের কারণেই ইংরেজরা প্রথমে ব্যবসার উদ্দেশ্যে এ ভূখণ্ডে আসে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর পরাজয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি হারায় এবং পরবর্তী এক শতাব্দীজুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। তিনি আরও বলেন, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষ প্রথম আজাদী লাভ করে। পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ায় ১৯৭১ সালে অর্জিত হয় দ্বিতীয় আজাদী। সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, যা কোনো শক্তিই দমন করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না।

বিশেষ আলোচক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ তাঁর তথ্যবহুল বক্তব্যে তুলে ধরেন, কীভাবে ১৬০০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আধিপত্যের ভিত্তি নির্মিত হয়। তিনি মুঘল আমলের নৌশক্তির দুর্বলতা, ১৭১৩ সালে সম্রাট ফররুখ শিয়রের বিতর্কিত ফরমান এবং এর ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীদের ওপর সৃষ্ট বৈষম্যের ইতিহাস বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নবাব সিরাজউদ্দৌলাই ছিলেন প্রথম শাসক যিনি ইংরেজদের কর্মকাণ্ডকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

আলোচকবৃন্দ ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং ব্রিটিশদের প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, ইংরেজরা এ দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পাশাপাশি সমাজের শিক্ষা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। তাঁদের মতে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ঐতিহ্যবাহী ওয়াকফভিত্তিক শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে মসলিন শিল্পের ধ্বংস, জোরপূর্বক নীলচাষ এবং ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে উপনিবেশিক শাসন একটি গভীর জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক সংকট সৃষ্টি করেছিল।

পরিশেষে বক্তারা আজাদীর সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সচেতন ও অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য ছাত্রসমাজের প্রতি আহ্বান জানান।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173595