মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা এবং জনগণের প্রত্যাশা

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা এবং জনগণের প্রত্যাশা

আমরা সবাই জানি এসএসএফ অর্থাৎ স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স সরকারের একটি বিশেষ উন্নত বাহিনী। যে বাহিনীর কাজ হচ্ছে সরকার প্রধানসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া। ১৮ই জুন ’২০২৬ তারিখে সেই বাহিনীর ৪০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ছিল। ছিল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানও। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উক্ত প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে উক্ত অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি বলেন, “সরকার প্রধান হিসাবে জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসার  ওপর আমার সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা, তাই নিরাপত্তার ঘেরাটোপ যাতে সরকার প্রধানকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়, উন্নত বাহিনী হিসাবে সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখার জন্য এসএসএফের প্রতি আহবান জানাই”। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, কারণ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় জনগণই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। একজন ভালো শাসকের সব সময় চিন্তা থাকে জনগণের জন্যে ভালো কিছু করা। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন বলেছেন, “জীবনও যখন শুকাইয়া যায়, করুণা ধারায় এসো” অর্থাৎ সময় যখন শেষ হয়ে যাবে তখন  সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ নিয়েই তোমাকে থাকতে হবে। তেমনি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সরকার প্রধানকে ৫ বছর পর ক্ষমতার মসনদ থেকে সরে এসে জনগণের কাতারেই তাঁকে দাঁড়াতে হবে। জনগণের ভালোবাসাই প্রকৃত ভালোবাসা। এসএসএফ নিশ্চয়ই তাঁদের দায়িত্ব পালন করবেন, কারণ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যেই তাঁদের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, নিশ্চয়ই তাঁরা অতিরঞ্জিত কিছু করবেন না, তাঁদেরও মনে রাখতে হবে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তাঁদেরও বেতন হয় সুতরাং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিকে জনগণ থেকে দূরে রাখা সমীচীন নয় অর্থাৎ ঘুরে-ফিরে আমরা সকলেই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ একবার দুঃখ করে বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর একটি সিগারেটও পুরা খেতে পারি না কারণ নিরাপত্তায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা  সিগারেট দুইটান খাওয়ার  পরে আমাকে খেতে দেয়। সরকার প্রধানসহ সরকারি কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী যেন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয় তা আমাদের সবাইকে  খেয়াল রাখতে হবে। ক্ষমতায় না থেকেও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে অনেকেই জাতীয় নেতা হয়েছেন। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী কোনদিনই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন না অথচ জনগণ তাঁকে মনে রেখেছে, তিনি জাতীয় নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। তিনি জানতেন, ভারতের তৈরি সর্বনাশা ফারাক্কা বাঁধ তিনি ভাঙতে পারবেন না, তারপরেও তিনি ফারাক্কা বাঁধ অভিমূখে লং মার্চ করে ইতিহাসে অমলিন হয়ে আছেন। দেশ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটানোর জন্যে বাংলার আনাচে-কানাচে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মিটিং মিছিল করেছেন। জনগণের সঙ্গে থেকে লং মার্চ করেছেন, তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে তাঁকে আগলে রেখেছেন, তাঁর বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়নি, কারণ জনগণের নেতা জনগণই পাহারা দিয়েছে, অথচ সুসজ্জিত রক্ষীবাহিনী এবং সামরিক বাহিনী হাতে থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিবকে পরিবারসহ কেউ রক্ষা করতে পারেনি। বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বহু দেশে সামরিক অভ্যুত্থানে বহু শাসক প্রাণ হারিয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দক্ষিণ ভিয়েতনাম, লাইবেরিয়া, বুরকিনো ফাসো, বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা, ইয়েমেন, গিনি, মালি, নাইজার, চাদ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, দক্ষিণ ভিয়েতনাম, কিউবা, বলিভিয়া, চিলি, আর্জেন্টিনা প্রমূখ। ব্যক্তিগত দেহরক্ষী থাকা সত্ত্বেও ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি নাথুরাম বিনায়ক গডসে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করে, ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর দুইজন দেহরক্ষী  সতবন্ত সিং এবং বিন্ত সিং তাঁর বাসভবনে ১৯৮৪ সনে হত্যা করে। দেহরক্ষী থাকা সত্ত্বেও বেনজীর ভুট্টোকে বাঁচানো যায় নি, সুতরাং পর্যাপ্ত সিকিউরিটি দিলেই যে নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা হবে এমন কথাও হলফ করে বলা যায় না। তারপরেও সরকার প্রধানকে এসএসএফ এর নিরাপত্তা দিতে হবে, তবে জনগণের সঙ্গে অশালিন আচরণ করে নয়। অনেক সময় দেখা যায়, ময়লাযুক্ত কাপড়-চোপড়, উসকো-খুসকো চুল, খালি পায়ে অনেক ত্যাগী কর্মী প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার পথে পথ আগলায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গাড়ি থামিয়ে তাঁদের কাছে গেলে তাঁরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে, এই সকল কর্মীরাই দলের প্রাণভোমরা, তাঁদের ত্যাগ অনস্বীকার্য, ১৭ বছর এই সকল নেতাকর্মী লড়াই-সংগ্রাম করে দল ধরে রেখেছে, সুতরাং নেতাকর্মীসহ জনগণের প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখার, এই সকল ত্যাগী নেতাকর্মীদের একটু ছাড় দিতে হবে, কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ৫ বছর পর আবার তাঁদের কাছেই ফিরে আসতে হবে। একটি ঘটনা বলে লেখার ইতি টানবো।  মার্ক রুটে, নেদারল্যান্ডস’র প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৪ই অক্টোবর’২০১০ তারিখে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ২রা জুলাই ’২০২৪ সনে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। তিনি যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন নিজের সাইকেলে চড়ে অফিস করতেন এবং যেদিন ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন সেদিনও ওই সাইকেলে চড়েই নিজের বাড়িতে যান। বিদায়ের দৃশ্যটি বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। তিনি এখন ন্যাটোর মহাসচিব। এই ঘটনা একটা বার্তাই দেয় আর তাহলো, ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু বিনয় ও জনগণের প্রতি সম্মান স্থায়ী।

লেখক :

এড. মোঃ মোজাম্মেল হক

উপদেষ্টা, বগুড়া জেলা বিএনপি।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173444