ভিক্ষুকের মুষ্টির চাল থেকে গ্লোবাল টিএমএসএস : লড়াই ও সাফল্যের আদ্যোপান্ত

ভিক্ষুকের মুষ্টির চাল থেকে গ্লোবাল টিএমএসএস : লড়াই ও সাফল্যের আদ্যোপান্ত

ক্ষুদ্রঋণের সমালোচনা ও সামাজিক উদ্যোক্তার দর্শন : দৈনিক করতোয়ার মুখোমুখি ড. হোসনে আরা বেগম। বগুড়া সদরের গোকুল ইউনিয়নের ঠেঙ্গামারা গ্রামে অসহায় নারী ও ভিক্ষুকদের হাত ধরে ১৯৬৪ সালে জন্ম হয়েছিলো ‘ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ’।

সেই ক্ষুদ্র সংগঠনটি কীভাবে পরবর্তীতে বগুড়াসহ সারাদেশে নামকরা একটি স্বনামধন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে (টিএমএসএস) রূপ নিয়েছিল, সেটারই আদ্যোপান্ত নিয়ে দৈনিক করতোয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন সংস্থাটির প্রধান ড. হোসনে আরা বেগম। তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন দৈনিক করতোয়ার সিনিয়র রিপোর্টার নাসিমা সুলতানা ছুটু।

করতোয়া : টিএমএসএস বা ঠেঙ্গামারা সবুজ সংঘের শুরু কবে?
ড. হোসনে আরা বেগম : ১৯৬৪ সাল। তখন আমি গোকুল হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। সেই সময় এই গ্রামের ফাতেমা নামে এক নারী ভিক্ষুকের নেতৃত্বে ‘ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ’ এর সৃষ্টি হয়। কারিতাসের ‘কোর’ নামে একটি অঙ্গসংগঠন তাদের সহায়তা করতো। রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত এই সংগঠনটিতে সে সময় যে নারীরা কাজ করতেন তাদের সবাই মধ্যবয়স্ক ও বৃদ্ধা ছিলেন।

এদের কেউ ভিক্ষা করতেন, কেউবা মানুষের জমিতে মরিচ ও আলু তোলার কাজ করতেন, কেউবা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। বর্তমানে যেটা টিএমএসএস মাদ্রাসা, তখন সেটি মাটির ঘর ছিল এবং ওখানেই তাদের কার্যক্রম চলতো। এভাবে চলতে চলতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের পর দেখা যায় ওই ঘরটি ভেঙে গেছে। সেখানে শুধু কিছু তার এবং কাগজপত্র পড়ে আছে। ওই ঘরে পায়ের মোজা তৈরির একটি মেশিন ছিল, সেটিও ভেঙে পড়ে ছিল। স্বাধীনতার পর তাদের কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল।

করতোয়া : ভিক্ষুকের মুষ্টির চাল দিয়ে যে টিএমএসএস শুরু হয়েছিল, তা আজ দেশের অন্যতম শীর্ষ এনজিও? শুরুর কঠিন দিনগুলো এবং চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে চাই?

ড. হোসনে আরা বেগম : ১৯৮০ সালে আমি যখন নতুন করে টিএমএসএস’র দায়িত্ব নিই, তখন একটি মাটির ঘর, সমিতির কিছু কাগজপত্র, একটি বোর্ড, ২৫টি ড্রাম, ২০৬ মণ চাল এবং ১২৬ জন নারী ভিক্ষুক ওই সমিতির সদস্য ছিলেন। ওই বোর্ডে ৫ কেজি করে চালের রেখা আঁকা থাকতো। যার রেখা যত বড়, তার চাল সংগ্রহ তত বেশি। কাগজপত্র নতুন করে নবায়ন করে দায়িত্ব নিই। ওই সমিতির সদস্যরা সিদ্ধান্ত দেন যে, প্রতি মঙ্গলবার তারা একবেলা ভিক্ষেসহ যার যা কাজ ছিল সেটি না করে সমিতিতে এসে মিটিং করবেন।

প্রথম মঙ্গলবারের মিটিংয়ে প্রায় ৫০০ নারী ভিক্ষুক জড়ো হয়েছিলেন। এর মধ্যে আগ্রহ ও উৎসাহ দেখে ৩৩৬ নারীকে সদস্য করে সমিতিকে বড় করা হলো এবং সদস্যদের ১৪টি গ্রুপে ভাগ করা হলো। এরপরে ভিক্ষুকেরা যে চাল সংগ্রহ করে, তা নিয়ে আরেক বিড়ম্বনা শুরু হলো।

কারো চাল মোটা, কারো চাল সরু এই নিয়ে চলে বাক-বিতণ্ডা ও বিরোধ। তখন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন, যেহেতু চাল নিয়ে অসন্তুষ্টি, তাই তারা চাল নিজেদের কাছে রেখে প্রত্যেকে ২ টাকা করে জমা দেবো। এভাবেই টিএমএসএসের নতুন যাত্রা শুরু হয়।

করতোয়া : কোথাও থেকে কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন কি না?
ড. হোসনে আরা বেগম : ১৯৮২-৮৩ সালের ঘটনা। সেই সময় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ইউনিসেফ ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেয়। এছাড়া ইউনিসেফের সহযোগিতায় স্যানিটেশন সেন্টারের জন্য স্ল্যাব, রিং, ল্যাট্রিন এগুলো তৈরি করে বিক্রি করা হতো। এসব তৈরির জন্য ইউনিসেফ যন্ত্রপাতি ও সামান্য কিছু অর্থ দিয়েছিল খোয়া, বালু ও সিমেন্ট কেনার জন্য। কিন্তু আমরা নদী থেকে বালু তুলতাম, রাস্তার দু’পাশ থেকে খোয়া সংগ্রহ করা হতো। শুধু সিমেন্ট কেনা হতো। আমাদের সমিতির সদস্যভুক্ত ভিক্ষুক নারীরাই এগুলো সংগ্রহ করতেন। এভাবে রিং, স্ল্যাব ও ল্যাট্রিন তৈরি ও বিক্রি করে আমাদের সে সময় প্রায় ২৭ লাখ টাকার মতো পুঁজি হয়েছিল।

করতোয়া : শিক্ষকতা পেশায় এলেন কীভাবে?
ড. হোসনে আরা বেগম : ১৯৭৫ সালের পরে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে ফিরে আসি। বগুড়ায় এসে সে সময়ের জনপ্রিয় লেখিকা রোমেনা আফাজের সঙ্গে দেখা করি। তাঁর সঙ্গে জাতীয় মহিলা সংস্থায় বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজ করতাম, পাশাপাশি বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করতাম এবং ভালো একটি চাকরির সন্ধান করছিলাম।

এরই মধ্যে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বগুড়ায় আসেন। তখন রোমেনা আফাজ আমাকে সার্কিট হাউজে নিয়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এই মেয়েটি খুব মেধাবী ছাত্রী। তার জীবনে রূপান্তরের মতো একটি ট্রাজেডি ঘটে গেছে। তাকে একটি ভালো সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা যায় কি না’। প্রেসিডেন্ট আমার আবেদনে একটি স্বাক্ষর করে তার সাথে থাকা এক সামরিক অফিসারের হাতে দিলেন।

এরপর ডিপিআই থেকে চিঠি আসে যেন আমি জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় গিয়ে দেখা করি। ঢাকায় গিয়ে জানতে পারি একটি সরকারি কলেজে আমার চাকরি হয়েছে। সর্বসাকুল্যে ১৭শ’ টাকা বেতন। আমি খুব খুশি হয়ে গেলাম।

করতোয়া : একজন শিক্ষকের নিশ্চিত জীবন ছেড়ে অনিশ্চিত এক এনজিও’র হাল ধরার পেছনে মূল জেদটা কী ছিল?
ড. হোসনে আরা বেগম : ১৯৭৯ সালে বগুড়া সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজে আমি চাকরিতে যোগদান করি। কিন্তু চাকরিতে গিয়ে আমি শান্তি পেতাম না, কারণ আমার ইচ্ছে ছিল সমাজসেবা ও অসহায় মানুষের জন্য কাজ করা। তাই কলেজে ক্লাস নেওয়ার ফাঁকে যখন অবসর মিলতো, তখন কোর্টে যেতাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম যারা গরিব, বেশি টাকা দিতে পারে না, তাদের মামলাগুলো উকিলরা ঝুলিয়ে রাখে। তখন ওই গরিব মানুষদের হয়ে উকিলদের চাপ দিতে থাকি।

তারপর বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে যেসব রোগী লেখাপড়ার অভাবে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন পড়তে পারতেন না, তাদের প্রেসক্রিপশন পড়ে ওষুধ নিতে সহযোগিতা করতাম। এভাবে চলতে থাকলে একদিন আমার স্বামী আনছার আলী আমাকে কোর্টে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বললেন, তুমি অযথা কোর্টে গিয়ে উকিলদের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করো কেন? এটা নিয়ে মানুষ নানা কথা বলে।

তোমার কোর্টে যাওয়ার দরকার নেই, শিক্ষকতার চাকরি করছো সেটাই করো। কিন্তু আমার ইচ্ছেই ছিল মানুষের সেবা করা। এরই মধ্যে ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘের জোমেলা, ফাতেমাসহ বেশ কিছু নারী আমার কাছে এসে টিএমএসএস’র দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বললেন, যুদ্ধের সময় থেকে তাদের সংস্থাটি বন্ধ রয়েছে। পরবর্তী সময় চালু করলেও অনেকে ভয় দেখায় ও টিপ্পনী কাটে, তাই তাদের একজন শক্ত মাথার ছাতার প্রয়োজন।

তখন ভাবলাম, গরিব-অসহায় মানুষের কাজ করার জন্য এমনই একটি জায়গা তো আমি খুঁজছিলাম। এটিই ছিল আমার মূল জেদ। মূলত ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে অবসরটাকে কাজে লাগিয়ে ঠেঙ্গামারা সবুজ সংঘকে সময় দিয়েছি। সেই সময় টিএমএসএস’র ২১ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার একজন সদস্য ছিলাম আমি।

করতোয়া : আপনি সরকারি চাকরি ছেড়েছেন কবে?
ড. হোসনে আরা বেগম : আমি সরকারি চাকরি ছেড়েছি সম্ভবত ২০০৮ সালে। মূলত নিয়মিত চাকরি করেছি ১৬ বছর। এরপর আমাকে বিভিন্ন জায়গায় বদলি করা হলে আমি লিয়েন ছুটি নিয়ে বগুড়াতেই থেকেছি। কিছুদিন ফাঁকা রেখে আবার লিয়েন নিয়েছি। এইভাবে তদবির করে আমি প্রায় নয় বছর লিয়েন ছুটি কাটিয়েছি, তবে আমি আমার চাকরির ২৫ বছর পূর্তি করে তবেই অবসর নিয়েছি।

করতোয়া : আপনার জীবনে একটা রূপান্তর ঘটেছে, এই রূপান্তরটাই ছিল কি আপনার জন্য টার্নিং পয়েন্ট?
ড. হোসনে আরা বেগম: হ্যাঁ বলতে পারেন, কারণ এই রূপান্তরটাই আমার জীবনে কাজ করার স্পৃহা জুগিয়েছিল। তখন চিকিৎসকরা বলেছিলেন আমার যে অপারেশন হবে, সেটি ছিল আমার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। তখন আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, যদি বেঁচে থাকি তবে মানুষের জন্য কাজ করব। এই রূপান্তরটাই আমাকে মানসিক শক্তি যুগিয়েছে যে আমি বেঁচে আছি এবং এই বেঁচে থাকাটাকে আমি মানুষের কল্যাণে কাজে লাগিয়েছি। আমি যেহেতু বেঁচে আছি, শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের সেবা করব, না হলে হয়তো আরও বড় বিপদ আসতে পারতো।

করতোয়া : টিএমএসএস এর ক্ষুদ্র ঋণের উচ্চ সুদ হার নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রায়ই সমালোচনা হয়, এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
ড. হোসনে আরা বেগম : উচ্চ সুদের হার নিয়ে আমার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা হয়, সেটা আমি সম্পূর্ণ দ্বিমত করি। কেননা সুদের হার নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার, তাই এই জন্য দায়ী সরকার। ক্ষুদ্রঋণ হলো হাইলি ক্লোজ ইনটেনসিভ ও হার্ড সুপারভাইজিং প্রোগ্রাম। এই প্রোগ্রামের আওতায় জামানতমুক্ত ঋণের জন্য বাড়ি বাড়ি যেতে হয়, কঠোর পরিশ্রম করতে হয় এবং কর্মীসংখ্যাও বেশি নিতে হয়।

সুদের হার কত হওয়া উচিত, তা সরকার কয়েকটি গবেষণা করে নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেটাই নেওয়া হয়। এজন্য সামাজিক বদনাম হলে তা সরকারের হওয়া উচিত। আমাদের ১২ মাসে বছর হয় না, কারণ অনেক ঋণগ্রহীতা মাসে ২-৩ টা কিস্তি দিতে পারে না। সেক্ষেত্রে ঋণ আদায় করতে করতে ১৫ মাস হয়ে যায়। তাই যারা সমালোচনা করেন তাদের বলব, তারা কম হারে সুদ নিয়ে আমাদের একটু পথ দেখান।

করতোয়া : ঋণের ফাঁদ ভাঙতে টিএমএসএস ঋণ গ্রহীতাদের স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী করছে কীভাবে? শুধু টাকা ধার দেয়া ছাড়া আপনাদের বিকল্প টেকসই মডেলটি কী?
ড. হোসনে আরা বেগম : যাদের ক্ষুদ্রঋণ বা টাকা দেওয়া হয়, তাদেরকে আমরা আমাদের পরিবারভুক্ত মনে করি। সারাদেশে আমাদের প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার সমিতি আছে। এই সমিতিগুলোর মাধ্যমে যারা টাকা ধার নেন, তাদের দায়িত্ব সম্পূর্ণ সমিতি নেয়। সমিতিভুক্ত হলে তাদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ অন্যান্য সব সমস্যার পাশেই সমিতি থাকে। আর সমিতিকে ফ্যাসিলিটেট করে আমাদের কর্মচারীরা, ফলে তাদের ভুল এবং ক্ষতির আশঙ্কা কম হয়।

করতোয়া : কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে তো বকেয়া আদায়ের জন্য বাড়ির চালের টিন পর্যন্ত খুলে নেওয়া হয় বলে শোনা যায়?
ড. হোসনে আরা বেগম : সমিতির নেতা বলে দেন কাকে কী কাজের জন্য ঋণ দিতে হবে। পরবর্তীতে চাপের মাধ্যমে সমিতিই টাকা আদায় করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়ির চালের টিন খুলে নেওয়ার ঘটনা অন্য সব সমিতি করলেও আমরা এক্ষেত্রে অনেক পেছনে থাকি (অর্থাৎ এমন চরম পন্থা এড়িয়ে চলি)। তবুও এখন পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণেরই প্রায় ৫০০ কোটি টাকা মাঠে বকেয়া আছে।

এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য এসব মিলে আরও প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এজন্য আমরা ‘ডিউ... কন্ট্রোল ডোমেইন’ (ডিসিডি) নামে আরও একটি বিভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যার কাজই হবে মাঠ থেকে বকেয়া সংগ্রহ করা। ইতোমধ্যে জনবল নিয়োগ শুরু হয়েছে এবং আগামী জুলাই থেকে এর কাজ শুরু হবে।

করতোয়া : গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়নে প্রধান প্রতিবন্ধকতা কী বলে আপনি মনে করেন?
ড. হোসনে আরা বেগম : নারীদের ক্ষমতায়নের প্রধান প্রতিবন্ধকতা তাদের মেন্টাল রেডিয়েন্স (মানসিক প্রস্তুতি)। তারা কতটা ক্ষমতায়ন হতে চায়, তা আগে তাদেরই নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই মানসিকতা থাকতে থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত সমাজ, যে সমাজে সে অবস্থান তৈরি করতে চাইবে, সেই সমাজ কতটা সহায়ক। তৃতীয়ত হলো তার পরিবার, পরিবার তাকে কতটা সাপোর্ট দিচ্ছে। নিজের মানসিকতা, পরিবার এবং সমাজ সব মিলিয়ে সাপোর্ট কতটা পাচ্ছে, সেটাই একটি নারীকে ক্ষমতায়নে সহযোগিতা করে।

করতোয়া : একটি এনজিওর অধীনে পাঁচতারকা হোটেল, বিনোদন পার্ক বা সিএনজি পাম্পের মতো বড় বড় বাণিজ্যিক উদ্যোগ কেন প্রয়োজন মনে করলেন? এর লভ্যাংশ কীভাবে প্রান্তিক সেবায় ব্যয় হচ্ছে?

ড. হোসনে আরা বেগম : অনেক মানুষকে অর্থনৈতিক সাপোর্ট দিলে তারা মেধা দিয়ে অনেক কাজ করবে, এজন্যই মাইক্রোক্রেডিট। কিন্তু মাইক্রোক্রেডিটের আয় সরকারের নিয়ম ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যয় করা যায় না, এটি বিশ্বব্যাপী নিয়ম। আমরা যদি ক্যানসার হাসপাতালসহ অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান চালাতে চাই, তার জন্য ডোনার বা সাহায্য পাই না। আমরা প্রান্তিকদের সহযোগিতা করি ক্যানসার হাসপাতাল ও প্রবীণ নিবাসের মাধ্যমে, যেখানে চিকিৎসা থেকে খাদ্য সবকিছুতেই আমাদের সহযোগিতার হাত থাকে।

২০২১ সাল থেকে আমাদের আয় কিছুটা কমে গেছে, ফলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো ভালোভাবে চালাতে পারছি না কারণ কর্মরতদের খরচটাই ঠিকমতো উঠছে না। আর এই ঘাটতি মেটাতেই বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলো প্রয়োজন হয়েছে, যেখান থেকে অর্জিত লভ্যাংশ প্রান্তিক সেবায় ব্যয় করা যায়।

করতোয়া : টিএমএসএস এখন বড় বড় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল পরিচালনা করছে। দেশের সাধারণ প্রান্তিক মানুষেরা এই বড় বড় প্রজেক্ট থেকে কতটুকু সাশ্রয়ী চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন?
ড. হোসনে আরা বেগম : আমাদের সিদ্ধান্ত আছে যারা পয়সাওয়ালা, তাদের কাছ থেকে আমরা বাজার মূল্যে টাকা নেব, আর যারা দরিদ্র বা অসহায়, তাদের বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে সেবা দেবো। কিন্তু ইদানীং পয়সাওয়ালা লোকেরা খুবই কম আসছে।

তারা মনে করছে টিএমএসএস হাসপাতালে চিকিৎসা করালে নিজেদের এলিট প্রমাণ করতে পারবে না, তাই তারা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করায়। তাদের ধারণা এখানে ভালো চিকিৎসা হবে না, যমনটা বলে ‘ঘর কা মুরগি ডাল বারবার’। টিএমএসএস যে এত ভালো চিকিৎসা করতে পারে, এটা ভাবতেও অনেকের কষ্ট হয়। বিত্তবান রোগীর অভাবে আমরা ইকোনমিক টার্গেট ফিলাপ করতে পারছি না, ফলে চ্যারিটিতে যেভাবে ফ্রিতে বড় পরিসরে সহায়তা করা দরকার, সেখানে কিছুটা সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

করতোয়া : টিএমএসএস পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তরুণদের আধুনিক কর্মমুখী শিক্ষায় কতটা দক্ষ করে গড়ে তুলছে?
ড. হোসনে আরা বেগম : আমাদের সব প্রতিষ্ঠানই জীবনঘনিষ্ঠ ও কর্মমুখী। যেমন আমাদের নার্সিং কলেজে ইন্টারভিউ নিয়ে ভর্তি করাতে হয় এবং এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমান বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হয়। এমনকি আমাদের যে আলিম মাদ্রাসা রয়েছে, সেখানেও শিক্ষার্থীদের মোবাইল রিপেয়ারিং, কম্পিউটার ট্রেনিং ও মোটরসাইকেল সার্ভিসিংয়ের মতো কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তুলছি, যেন তারা শুধু মিলাদ ও জানাজা পড়ানোর ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজে উপার্জন করে খেতে পারে।


করতোয়া : বিভিন্ন গণমাধ্যমে দখল বা ভূমি সংক্রান্ত কিছু অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে এসেছে, এই সমালোচনা ও অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু?

ড. হোসনে আরা বেগম : অভিযোগগুলোর অফিশিয়ালি কোনো সত্যতা নেই। যেমন আমাদের গ্লাস ফ্যাক্টরির একটা জায়গা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই জমিটি তো আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় লিজ নিয়েছি এবং অবকাঠামো নির্মাণের সব কাগজপত্রও আছে। লিজ বাতিলের জন্য হাইকোর্টে কেস করা হয়েছে, কিন্তু লিজ বাতিল বা স্থগিত করা হয়নি, আইনসম্মতভাবে এখনো আমরা ওই জায়গার দাবিদার।

আমি মনে করি, এটি গরিবের সাথে বিদ্বেষ করে করা হয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব আমাকে বলেছেন যে, তাঁকে চাপে রেখে এই অন্যায় কাজটি করানো হয়েছিল। তৎকালীন উপদেষ্টা ইচ্ছেকৃতভাবেই তাঁর দীর্ঘদিনের ইচ্ছাটি সুযোগ পেয়ে পূরণ করেছেন।

করতোয়া : অন্তর্বর্তী সরকারকে তো বলা হতো এনজিওর সরকার, আপনিও এনজিও। তবে তারা আপনার এই ক্ষতিটা করল কেন?
ড. হোসনে আরা বেগম : গ্রামীণ প্রবাদ আছে ‘কাকের মাংস কাকে খায় না’, কিন্তু আমার সাথে সেই কাজটিই হয়েছে। তা না হলে মাত্র সাত দিনের ভিতরে ৩৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ করে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া অফিসকেও না জানিয়ে, কেন্দ্রীয় অফিস থেকে খনন করা হলো কীভাবে? এটি মূলত তৎকালীন পরিবেশ উপদেষ্টার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ইনটেনশন বা জেদ ছিল।

করতোয়া : উন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষা এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে টিএমএসএস বর্তমানে পরিবেশ সুরক্ষায় কী ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রজেক্ট বা আইনি সতর্কতা অবলম্বন করছে?

ড. হোসনে আরা বেগম : টিএমএসএস যেখানেই ইন্ডাস্ট্রি করেছে, সেখানেই উচ্চমানের শোধনাগার বা ইটিপি (ঊঞচ) রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি ইন্ডাস্ট্রিতে বা হাসপাতালেও এমন ব্যবস্থা নেই, যা আমাদের হাসপাতালে আছে। আমরা যে পরিবেশের প্রতি সতর্ক, এটিই তার প্রমাণ। এছাড়া আমরা যে ঋণ দিই, তার একটি বড় অংশ যায় স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিবেশবান্ধব স্যানিটেশন, বনায়ন ও সোলার প্যানেলের জন্য। এসবই পরিবেশ সুরক্ষার জন্য করা হয়।

করতোয়া : বর্তমানে টিএমএসএস এর কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে কতগুলো কর্মী রয়েছে?
ড. হোসনে আরা বেগম : টিএমএসএস’র অধীনে বর্তমানে ৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৫৪টি ট্রেনিং সেন্টার এবং ৬৪টি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসবগুলোকে আমরা ‘গ্লোবাল টিএমএসএস’ বলি। এই গ্লোবাল টিএমএসএসে বর্তমানে ৫২ হাজারেরও বেশি নিয়মিত ও বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন।

করতোয়া : আপনার অবর্তমানে টিএমএসএস এর নেতৃত্ব ও স্থায়িত্ব অক্ষুন্ন রাখতে কী ধরনের উত্তরসূরি বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করে যাচ্ছেন?
ড. হোসনে আরা বেগম : টিএমএসএস-এর নির্দিষ্ট অপারেশনাল পলিসি রয়েছে। সেই পলিসি অনুযায়ী এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর, ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর, সেক্টর প্রধান এভাবে পর্যায়ক্রমে পদগুলো বিন্যস্ত করা আছে এবং সবারই দায়িত্ব নেওয়ার মতো যোগ্যতা রয়েছে। এছাড়া ‘বেনিয়ান ট্রি’ (বটবৃক্ষ) নামে আমাদের একটি বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে, যার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা আছে। বটগাছের লতা বা ঝুড়ি যেমন মাটিতে গেঁথে আবার নতুন গাছের জন্ম দেয় এবং মূল গাছটি মরে গেলেও বটগাছটি বেঁচে থাকে, আমাদের প্রতিষ্ঠানও ঠিক সেভাবেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকে থাকবে।

করতোয়া : আপনার ছেলে কি ভবিষ্যতে টিএমএসএস’র হাল ধরতে পারেন?
ড. হোসনে আরা বেগম : ছেলে যদি যোগ্য হয় তবে আসবে, এখানে পরিবারের সদস্য হওয়ার কোনো বাড়তি মার্ক নেই। যোগ্যতার পাশাপাশি টিএমএসএস-এর নীতি, আদর্শ ও দর্শনের প্রতি ভক্তি এবং গ্রহণযোগ্যতা থাকলে তবেই সে আসবে। আমার ছেলে টিএমএসএসের ঋণদান বা বনায়ন কর্মসূচি পছন্দ করে না, সে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর পছন্দ করে এবং বর্তমানে ওই সেক্টরগুলোই দেখাশোনা করছে। আমরা দু’জনই কিন্তু টিএমএসএস’র সাধারণ বেতনভুক্ত কর্মী।


করতোয়া : নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণী যারা সামাজিক উদ্যোক্তা হতে চান, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ড. হোসনে আরা বেগম : সামাজিক উদ্যোক্তা বলতে আমরা বুঝি, যিনি এই উদ্যোগ নেবেন ব্যবসার লভ্যাংশের সব পয়সা তার পকেটে যাবে না। অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশ সমাজের কাজে ব্যয় হবে আর তিনি সেখান থেকে শুধু নিজের বেতনটুকু নেবেন। কিন্তু বেতনের পরিমাণ যদি এত বেশি হয় যে সামাজিক কাজের জন্য কোনো লভ্যাংশই থাকছে না, তবে সেটা সামাজিক উদ্যোগ নয়, ব্যক্তিগত ব্যবসা। ব্যক্তিগত উদ্যোগে লভ্যাংশ নিজের থাকে, কিন্তু সামাজিক উদ্যোক্তা হলে অবশ্যই আয়ের সিংহভাগ সামাজিক কল্যাণে ব্যয় করতে হবে।

করতোয়া : টিএমএসএস নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
ড. হোসনে আরা বেগম : আমরা যে কাজগুলো করছি সেগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া দেশের ৩৮টি জেলায় আমাদের প্রায় ৩ হাজার একর জমি পড়ে রয়েছে, সেগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই।

আর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো, ক্যানসার রোগীদের জন্য একটি অত্যাধুনিক ‘কার্টিসেল ল্যাবরেটরি’ (ঈঅজ-ঞ ঈবষষ খধনড়ৎধঃড়ৎু) করা। ঢাকার বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের পাশে আমাদের ৬ শতক জায়গার ওপর যে ভবন রয়েছে, সেখানেই এটি করার পরিকল্পনা চলছে। এটি সফল হলে ক্যানসার রোগীদের আর কষ্টদায়ক কেমোথেরাপি নিতে হবে না, জিনোমিক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমেই তারা সুস্থভাবে সারভাইভ করতে পারবে।

করতোয়া : করতোয়ার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।
ড. হোসনে আরা বেগম : টিএমএসএসের এই বিকাশের পেছনে ব্যাপক পাবলিক সাপোর্ট ছিল। বিরোধিতা করেছে মাত্র ৫ শতাংশের মতো মানুষ। আমরা যাদের সহযোগিতা পেয়েছি, তার মধ্যে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল অন্যতম, বিশেষ করে করতোয়া পত্রিকা। শুরুর দিকে আমরা যখন মিডিয়া বা পেপার-পত্রিকা কিছুই বুঝতাম না, তখন করতোয়ার সম্পাদক আমাদের এককভাবে সহযোগিতা করে গেছেন। এজন্য আমরা করতোয়া পরিবারের কাছে চিরকৃতজ্ঞ ও ঋণী।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173392