বগুড়ায় বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা, বড় অংশই নারী শিক্ষার্থী

বগুড়ায় বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা, বড় অংশই নারী শিক্ষার্থী

স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়ায় আত্মহত্যার প্রবণতা আশংকাজনকভাবে বাড়ছে। আত্মহননকারীদের একটি বড় অংশই হলো নারী শিক্ষার্থী। হতাশা,বিষন্নতা,প্রেম ঘটিত বিষয়সহ নানা কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। আত্মহত্যা বাড়লেও স্কুল-কলেজে নেই তেমন কোন সচেতনতামুলক কর্মসূচি। নেই কাউন্সিলিং।

বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের অনার্স ইংরাজি বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া রশিদ বলেন, মেয়েরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথা বলতে গেলে বিভিন্নভাবে সাইবার বুলিং এর শিকার হচ্ছে। ইমোতে, ম্যাসেঞ্জারে ও হোয়াটস এ্যাপসে বন্ধুদের সাথে ভিডিওকলে কথা বলতে গেলে ব্লাক মেইলিং করে মেয়েদেরকে হ্যারেজ করা হচ্ছে। যা মেনে নিতে না পেরে অনেক নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। তিনি আরো বলেন,দিন দিন আত্মহত্যার ঘটনা বাড়লে প্রতিরোধে নেই কোন সচেতনতা মূলক প্রচারণা।

একই কলেজের ছাত্র বায়েজিদ হাসান বলেন, মোটর সাইকেল ও মোবাইল ফোন কিনে না দেয়ায় অনেক স্কুল ও কলেজ ছাত্র আত্মহত্যা করে থাকে। আবার অনেক ছেলে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার করে থাকে। বেকারত্ব থেকেও কেউ কেউ আত্মহত্যা করে। তিনি বলেন আত্মহত্যারোধে গণসচেতনতা প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

বগুড়া মহানগরের সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা অভিভাবক আফরোজা বেগম শাপলা বলেন,এই সময়ের ছেলে মেয়েরা অতিরিক্ত আবেগ প্রবণ। এখনকার অধিকাংশ ছেলে-মেয়েদের চাহিদা বেশি তাই সহজেই তাদের মধ্যে কেউ কেউ অপরাধমুলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। যখন অনুশোচনায় ভোগে তখন তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

তিনি আরো বলেন,পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ কম। বাবা মায়েরাও  মোবাইল ফোনে দীর্ঘ সময় পার করে থাকে, তারা ছেলে মেয়েদের মানসিক দিকটা নিয়ে অতটা ভাবে না। নৈতিক শিক্ষা অর্জনের চেয়ে বর্তমানে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সবাই ছেলে মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত।এই অতিরিক্ত চাপ ছেলেমেয়ে দের আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে দেয়।

বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: মোস্তাফিজার রহমান আকন্দ বলেন, বগুড়াসহ সারাদেশে টিনএজ ছেলে-মেয়েদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। নানান কারনে হতাশা থেকে তারা আত্মহত্যা করে থাকে। বিশেষ করে বয়স সন্ধিকালে তাদের মধ্যে নানা হতাশা দেখা দেয়। এসময় তাদের মধ্যে যথাযথ উদ্দিপনা দরকার, তা তারা পায়না।

অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী হতাশার বিষয়টি অভিভাবকদের শেয়ার করতে পারেনা। অভিভাবকরাও এব্যাপারে তাদেরকে কাউন্সিলিং করেননা। এনিয়ে মা-বাবার সাথে তাদের দুরত্ব বাড়ে।অভিভাবকরা বাচ্চাদেরকে অর্থ দিয়ে, প্রাইভেট দিয়ে ও টিউশনি দিয়ে মনে করেন যে তাদের দায়িত্ব শেষ করছেন। কিন্তু কাউন্সিলিং করছেন না। তিনি বলেন, বয়স সন্ধিকালে বাচ্চাদেরকে স্বপ্ন দেখাতে হবে। কোনটা ভুল আর কোনটা সঠিক পথ সে বিষয়ে কাউন্সিলিং করাতে হবে। এখনকার বাচ্চারা খুবই স্পর্শকাতর। আদর স্নেহ দিয়ে তাদের ভুল ভেঙ্গে দিতে হবে।

সিআইডি বগুড়ার পুলিশ সুপার মো: মোতাহার হোসেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়, প্রেম,ভিডিও কলে প্রেমালাপ,আপত্তিকর ও অন্তরঙ্গ মূহুতের ছবি বিপদে ফেলছে মেয়ে শিক্ষার্থীদের। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, আত্মহত্যারোধে জনসচেনতা বাড়তে হবে।

জেলা পুলিশ সূত্রে পাওয়া এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, চলতি বছর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পাঁচ মাসে বগুড়া জেলায় ১১৬ জন আত্মহত্যা করেছে। এরমধ্যে জানুয়ারিতে ১৬ জন,ফেব্রুয়ারিতে ২৭ জন,মার্চ মাসে ২৯ জন,এপ্রিলে ২৪ জন ও মে মাসে ২০ জন আত্মহত্যা করেছে। আর আত্মহত্যার দিক শীর্ষে রয়েছে আদমদিঘী উপজেলা। এই ৫ মাসে আদমদিঘীতে আত্মহত্যা করেছে ১৬ জন।

পুলিশের পরিসংখ্যান থেকে আরো জানা যায়, গত বছর ২০২৫ সালে জেলায় ৪১১ জন আত্মহত্যা করলেও ২০২৪ সালে জেলায় ৩৩৫ জন, ২০২৩ সালে ৩৮৭ জন ও ২০২২ সালে ৩৮৫ জন আত্মহত্যা করে। সব মিলিয়ে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল এবং চলতি বছর ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত মোট চার বছর ৫ মাসে বগুড়া জেলায় মোট এক হাজার ৬৩৪ জন আত্মহত্যা করেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন,আত্মহত্যা প্রবণ এলাকা বগুড়া। যারা আত্মহত্যা করেন তার মধ্যে ২৫ শতাংশই নারী শিক্ষার্থী।

বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো: আতোয়ার রহমান বলেন, পারিবারিক  ও সামাজিক কারনে হতাশা থেকে মানুষ বেশি আত্মহত্যা করে থাকে। গলায় ফাঁস দিয়ে ও বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট সেবন ও বিষপানেই বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন আইন প্রয়োগ করে আত্মহত্যা ঠেকানো সম্ভব নয়। আইনে আত্মহত্যার পর আর কিছু করার থাকে না। তবে আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার বিধান আছে। কিন্তু বগুড়ায় আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে গেছে এমন কারোর বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি বলেন আত্মহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু সায়েম বলেন, পারিবারিক, সামাজিক ও পরিবেশগত কারণে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে। মূলত হতাশা থেকে মানুষ আত্মহত্যা করছে। শারিরিক, মানসিক কারণে ও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক কিশোর-কিশোরী, তরুণ, তরুণী, নারীসহ সব বয়সী মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। সিজোফেনিয়া, উদ্বেগ ও গোলযোগসহ নানা কারনে মানুষ আত্মহত্যা করছে।

তিনি বলেন, কারোর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা গেলে তাকে মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কাউন্সিলিং করতে হবে। আত্মহত্যা রোধে গণ সচেতনতা বাড়াতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বগুড়ার গবেষক ডা. মিজানুর রহমান তার এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, শুধু বগুড়া নয়, সারাদেশেই আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে। সেইসাথে সারা বিশ্বেও আত্মহত্যার হার বেড়ে গেছে।

গত ৫০ বছরে বিশ্বে আত্মহত্যার হার ৬০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা। স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ বিষন্নতায় ভুগছেন। গত ১০ বছরে বিশ্বব্যাপী এই রোগের ব্যাপকতা বেড়ে ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ডা. মিজানুর রহমান বলেন, বগুড়ায় আত্মহত্যা ও সামাজিক অপরাধ প্রবণতা উদ্বেগজনক।  আতঙ্কিত বিষয় হলো বাংলাদেশসহ বিশ্বে প্রতি বছর এই সংখ্যা বাড়ছেই।  বিশ্লেষকরা বলেন, পারিবারিক ও সামজিক সমস্যার কারণে দেশে আত্মহত্যা বাড়ছে। সবাই অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছেন এইজন্য সমস্যা তীব্রতর হচ্ছে। কর্মজীবী বাবা-মা’রা তাদের সন্তানদের সেভাবে সময় দেন না। সবকিছুই এখন ডিভাইস নির্ভর হয়ে গেছে। এটিও একটি কারণ।

ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক দুটোরই বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্করা পর্যন্ত গভীর ডিপ্রেসনে চলে যাচ্ছেন। এছাড়া সমাজে নানা অস্থিরতা বিরাজ করছে। ফলে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতাও। এ থেকে বের হয়ে আসতে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। এজন্য সবার আগে সচেতন হতে হবে পরিবারকে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে।

পাশাপাশি  ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মসজিদে-মসজিদে আত্মহত্যার ধর্মীয় ও সামাজিক কুফল সম্পর্কে বুঝাতে হবে। বিশ্লেষকরা বলেন, এখনকার প্রজন্ম অনেক বেশি স্পর্শকাতর। তাদের এমন কোন কথা বলা যাবে না, যা বুলিংয়ের পর্যায়ে যায়। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও আত্মহত্যার কুফল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। এছাড়া বেসরকারি সংস্থাগুলো উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে নারীদের আত্মহত্যা না করতে সচেতন করে তুলতে পারে।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173373