বগুড়ায় রিফাত হত্যা মামলা পাঁচজনের মৃত্যুদন্ড ও পাঁচ শিশুর মেয়াদি আটকাদেশ
কোর্ট রিপোর্টার : বগুড়ায় শিশু রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাতকে (৮) অপহরণসহ মুক্তিপণের দাবিতে হত্যা করে লাশ গুমের অপরাধে পৃথক ধারায় পাঁচ আসামির মৃত্যু দন্ডাদেশসহ মেয়াদি করাদন্ডাদেশ ও জরিমানা এবং পাঁচ শিশুকে বিভিন্ন মেয়াদি আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল নং-১ এবং শিশু আদালত নং-১ এর বিচারক মো. আনোয়ারুল হক ওই ঘটনার দু’টি মামলার এই রায় দেন।
রায়ে নারী ও শিশু মামলায় অভিযুক্ত পাঁচ আসামি হলো-শাজাহানপুর উপজেলার খাদাস ভোলাগাড়ীর আলতাফ হেসেনের ছেলে আবুল কালাম আজাদ ও জামাল উদ্দিনের ছেলে মো. সাগর, খাদাস তালুকদার পাড়ার মিলন হোসেনের ছেলে সেলিম ইসলাম ও মেহেদী হাসান এবং খাদাস মাঠপাড়ার মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে রাজু মিয়া ওরফে পাঁচফুল।
শিশু রিফাত হোসেনকে অপহরণের দায়ে প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড ও ২ লাখ টাকা করে অর্থদন্ড, অনাদায়ে আরও ২ বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ডাদেশ এবং মুক্তিপণ আদায়ের দাবির জন্য মৃত্যুদন্ডাদেশসহ ২ লাখ টাকা করে অর্থদন্ড, অনাদায়ে আরও ২ বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ডদেশ।
একই উদ্দেশ্যে ওই শিশুকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ডাদেশসহ ২ লাখ টাকা করে অর্থদন্ড, অনাদায়ে আরও ২ বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ডদেশসহ ওই শিশুর লাশ গুমের দায়ে ওই আসামিদেরকে ৭ বছর করে কারাদন্ডদেশ ও ১ লাখ টাকা করে অর্থদন্ড এবং অনাদায়ে আরও ১ বছর করে কারাদন্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।
হাইকোর্টের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রত্যেকের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করা হবে। আসামিদের বিরুদ্ধে প্রদত্ত সকল দন্ডাদেশ একত্রে কার্যকর হবে। আসামিদের ৭ দিনের মধ্যে আপিল দায়ের করতে পারবেন মর্মে রায়ে উল্লেখ করা হয়। ওই আসামিদের মধ্যে আসামি সেলিম ইসলাম ও মো. সাগর পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা ও সাজা পরোয়না ইস্যুর আদেশ দেওয়া হয়েছে।
অপর শিশু আইনে বিচারকৃত একই এলাকার অভিযুক্ত আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত পাঁচ শিশু যখাক্রমে-সজিব হাসান, মফিজুল ইসলাম, জাহিদ হাসান, বোরহান আলী, ও বায়োজিদ হোসেনকে অপহরণের দায়ে ৩ বছরের আটকাদেশ, মুক্তিপণ আদায়ের দাবির জন্য শিশু আইনে ১০ বছর করে আটকাদেশ এবং হত্যার দায়ে ১০ বছর করে আটকাদেশ এবং লাশ গুমের দায়ে ৩ বছরের আটকাদেশ প্রদান করা হয়েছে।
আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত শিশুদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রদত্ত আটকাদেশ একযোগে কার্যকর হবে মর্মে রায়ে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে ওই শিশুদের বয়স ২৬ বছরের ঊর্ধ্বে হওয়ায় তাদেরকে দোষী সাব্যস্তকরণ পরোয়ারামূলে বগুড়া জেলা করাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, এই মামলা দায়েরের সময় তাদের সকলের বয়স ১৮ বছরের নিচে থাকায় শিশু হিসেবে গণ্য হয়।
উল্লেখ্য, বিদেশ ফেরত বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার খাদাস হাটখোলাপাড়ার এনামুল হক খাদাস বাজারে মুদির দোকানের ব্যবসা করতেন। আসামি আবুল কালাম আজাদ তার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা ধার চাইলে এনামুল হক দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিগত ২০১৮ সালের ১৫ জুলাই রাত সোয়া ৮টার দিকে বাড়ির নিকট খাদাস হাটে শিশু রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত (৮) তার বাবার দোকানে যায় এবং পরে বাবাকে বলে সে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।
রাতে এনামুল বাড়িতে এসে জানতে পারে ছেলে রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত বাড়িতে আসেনি। এরপর তিনি ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে থানায় জিডি করেন। এরপর পরই এনামুল হকের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। কয়েক দিন পর রিফাতের অর্ধগলিত লাশ শাজাহানপুরের পোয়ালগাছার সিংহবাড়ীর ব্রিজের নিচে ভদ্রাবতীর নদীর কচুিরপানার মধ্যে পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে এনামুল হক বাদি হয়ে এই মামলা দায়ের করেন।
এদের মধ্যে আসামি শহিদুল ও খোকন ঘটনা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করে। খোকন ইতিমধ্যে মারা গেছে। মামলাটি তদন্ত শেষে শাজাহানপুর থানার তৎকালীন ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ পৃথক দু’টি চাজশিট দাখিল করেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলাটি পরিচালনা করেন বাদি রাষ্ট্রপক্ষে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নং-১ এর পিপি এড. আলী আসগার এবং শিশু আদালত নং-১ এর পিপি এড. সুফিয়া বেগম কোহিনুর এবং আসামি পক্ষে এড. এএইচএম গোলাম রব্বানী খান রোমান, এড. স্বপন সাহা, এড. আনোয়ার হোসেন পায়েল ও এড. শান্তা রানী দেব।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173348