পথশিশুদের জীবন সংগ্রাম 

পথশিশুদের জীবন সংগ্রাম 

জনম দু:খী অবহেলিত পথশিশুরা সব সময়ই নিগৃহীত। জন্ম নেওয়াটাই যেন এদের জন্য পাপ। হতভাগা এই সব পথশিশুরা প্রকৃতির সাথে দিবা-রাত্রি সংগ্রামের করতে করতে বড় হতে থাকে। দু:খ-কষ্ট যেন এদের পিছু ছাড়ে না। প্রতিকূলতার সাথে চ্যালেঞ্জ করে টিকে থাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে। বিশেষ করে বর্ষা-বাদল, ঝড়-ঝঞ্ঝার মত প্রকৃতির প্রতিকূল প্রতিবেশকে উপেক্ষা করে সর্বদা এরা জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। 

বাংলাদেশের বর্ষাকাল প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক হলেও, পথশিশুদের জন্য এটি এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের নামান্তর। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা তাদের জীবনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। নিরাপদ আশ্রয়, পর্যাপ্ত খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার অভাবে তারা প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। 

বর্ষাকালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে জলাবদ্ধতা একটি সাধারণ সমস্যা। কিশোরগঞ্জ শহরের ৬২ শতাংশ সড়কে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এই জলাবদ্ধতা পথশিশুদের জীবনে নানা ধরনের বিপদ ডেকে আনে। তারা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে খোলা আকাশের নিচে, ফুটপাত বা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। বৃষ্টির পানি ও কাদায় ভিজে তাদের শরীর ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়, যা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

২০২৪ সালের ২ অক্টোবর ঢাকার বংশালে বৃষ্টির পানিতে হেঁটে যাওয়ার সময় বিদ্যুতের খুঁটির সংস্পর্শে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ১২ বছর বয়সী মো. ইব্রাহীম নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। এই ঘটনা পথশিশুদের জীবনের অনিরাপত্তার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। বৃষ্টির সময় খোলা তার ও বৈদ্যুতিক খুঁটির সংস্পর্শে এসে এমন দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে, যা পথশিশুদের জন্য মারাত্মক হুমকি। 

বৃষ্টির কারণে পথশিশুদের শিক্ষাজীবনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। গাইবান্ধার কলমু এফএনসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় দেড় বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান চলছে । বৃষ্টি হলেই পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়, যা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও আগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পথশিশুরা এমনিতেই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত; বৃষ্টির কারণে এই বঞ্চনা আরও গভীর হয়। বর্ষাকালে পথশিশুরা ঠান্ডাজনিত রোগ যেমন নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয়। গরম পোশাক ও পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেক সময় এসব রোগে আক্রান্ত হয়ে তারা মৃত্যুবরণ করে। 

পথশিশুদের দুর্দশা লাঘবে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শীতবস্ত্র বিতরণ, অস্থায়ী আশ্রয়স্থল নির্মাণ, মোবাইল মেডিকেল টিমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। এছাড়া, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করে ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগে পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানো উচিত । 

বৃষ্টি প্রকৃতির আশীর্বাদ হলেও, পথশিশুদের জন্য এটি এক অভিশাপ। তাদের জীবনের প্রতিটি ফোঁটায় লুকিয়ে থাকে সংগ্রামের গল্প। এই শিশুদের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে প্রতিটি শিশুর জীবন হবে নিরাপদ ও সুন্দর। 

লেখক :

সাদিয়া সুলতানা রিমি

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173208