বগুড়ায় আধুনিক শিল্পপার্ক: উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক রূপান্তরের দরজা এখনই খুলতে হবে

বগুড়ায় আধুনিক শিল্পপার্ক: উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক রূপান্তরের দরজা এখনই খুলতে হবে

বাংলাদেশের মানচিত্রে বগুড়া কেবল একটি জেলার নাম নয়, এটি উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার, একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্র এবং কৃষি, মেধা ও উদ্যোক্তা শক্তির এক অসাধারণ সমন্বয়ভূমি। প্রাচীন পুন্ড্রর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড়ের এই মাটিতে হাজার বছর আগে যে সভ্যতার দীপ জ্বলেছিল, আজও সেই দীপ নেভেনি। কিন্তু আধুনিক শিল্পায়নের আলো থেকে বগুড়া এখনো বঞ্চিত। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর এই বঞ্চনার অবসান এবং অঞ্চলের কোটি মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের জন্য বগুড়ায় একটি আধুনিক শিল্পপার্ক স্থাপন এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি ও যৌক্তিক দাবি। প্রশ্ন হলো, কেন বগুড়া? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বগুড়ার শিল্প-বাণিজ্যের বাস্তব তথ্যের মধ্যে, যা অনেকেই জানেন না। বগুড়া জেলায় ইতিমধ্যে ১২০টি বড় শিল্প কারখানা, ১৯টি মাঝারি শিল্প কারখানা, ২ হাজার ৩৫১টি ক্ষুদ্র শিল্প এবং ৭৪৫টি কৃষি ভিত্তিক শিল্প রয়েছে। এই বিশাল শিল্প কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বগুড়ায় কোনো পরিকল্পিত আধুনিক শিল্পপার্ক নেই, যা এই শিল্পগুলোকে একটি সংগঠিত, প্রযুক্তিবান্ধব এবং রপ্তানিমুখী প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে পারে। বর্তমানে আধুনিক বগুড়া বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের একটি প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র, যা দেশের শীর্ষ ১০ শহুরে অর্থনীতির মধ্যে স্থান পেয়েছে এবং এখানে শিল্প খাতে ৪ হাজারেরও বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা রয়েছে, যেগুলো খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্লাস্টিক, বেকারি, বস্ত্র, মৎস্য সরঞ্জাম ও লোহাশিল্পে নিয়োজিত এবং ভারত, নেপাল ও মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য রপ্তানি করে।  অর্থাৎ বগুড়া ইতিমধ্যেই শিল্পের একটি জীবন্ত কেন্দ্র, কেবল একটি আধুনিক শিল্পপার্কের মাধ্যমে এই কেন্দ্রকে বিশ্বমানের শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব। বগুড়ার সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা হলো এর হালকা প্রকৌশল ও কৃষি যন্ত্রপাতি শিল্প। বগুড়ায় তৈরি হয় প্রায় ২ হাজার রকমের হালকা প্রকৌশল ও কৃষি যন্ত্রপাতি এবং দেশের কৃষি যন্ত্রপাতির বার্ষিক চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করে এখানকার কারখানাগুলো, যার আর্থিক মূল্য এক হাজার কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, কৃষিকাজে ব্যবহৃত সেচপাম্পের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ দেশে তৈরি হয় এবং সেই দেশীয় সেচপাম্পের ৭০ শতাংশই তৈরি হয় বগুড়ার ফাউন্ড্রি ও হালকা প্রকৌশল কারখানায়।  এই তথ্যটি চমকপ্রদ। অর্থাৎ বাংলাদেশের কৃষিযন্ত্র শিল্পের কার্যত হৃৎপিন্ড হলো বগুড়া। ১৯৯৫ সালে ভারতে সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প রপ্তানির মধ্য দিয়ে বিদেশের বাজারে প্রবেশ করে বগুড়ার কৃষিশিল্প। এরপর ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটান প্রভৃতি দেশে সেচপাম্প, টিউবওয়েল, পানির পাম্প, ধানমাড়াইয়ের যন্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি রপ্তানি হচ্ছে এবং বগুড়ার পণ্য বর্তমানে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপানসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাজারেও যাচ্ছে। এই অর্জন আরও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে যখন আমরা জানি যে বগুড়ার কৃষি ও হালকা প্রকৌশল যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনের নেপথ্য কারিগরেরা যন্ত্রাংশের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে কামারশালায় লোহা পিটিয়ে বিকল যন্ত্র সারাতেন, এবং এভাবে লোহা পিটিয়ে যন্ত্রাংশ তৈরি করতে করতেই তারা একের পর এক কৃষি ও হালকা যন্ত্রাংশ উদ্ভাবন করেন। কামারশালার হাতুড়ির শব্দ থেকে আজকের হাজার কোটি টাকার শিল্পসাম্রাজ্য, এই যাত্রা বগুড়ার মানুষের অদম্য উদ্যমের প্রমাণ। কিন্তু এই বিশাল সম্ভাবনা এখনো তার পূর্ণ উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি কারণ নানামুখী সমস্যার কারণে সুযোগটি কাজে লাগানো যাচ্ছে না এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা, নীতি সহায়তা, উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও শিল্পপার্ক স্থাপনে কার্যকর উদ্যোগ নিলে অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে উদ্যোক্তারা মনে করেন। বগুড়ার আরেকটি অনন্য শক্তি হলো এর বিশাল ও বৈচিত্র্যময় কৃষি উৎপাদন, যা শিল্পপার্কের জন্য একটি নিশ্চিত কাঁচামাল সরবরাহের ভিত্তি তৈরি করে। বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। দেশের খাদ্য চাহিদার ৫০ শতাংশ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের কাঁচামালের ৭০ ভাগের জোগান আসে এ অঞ্চল থেকে। এসব জেলায় প্রচুর পরিমাণে আলু, টমেটো, পেঁয়াজ, রসুন, আম, কলা, লিচু, কাঁঠাল, শাকসবজি, ফলমূল ও ধান উৎপন্ন হয়।  কিন্তু খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পনগরী না থাকায় একদিকে কৃষক পণ্যের যথাযথ দাম পাচ্ছে না, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ পণ্য নষ্ট হয়ে যায় এবং ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই সংকটের সমাধান একটি পরিপূর্ণ শিল্পপার্কে। সরকারের পক্ষ থেকে এই বাস্তবতা উপলব্ধি হয়েছে বলেই বিসিক বগুড়ায় ৩০০ একর জায়গার ওপর প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পনগরী করতে চায় এবং বিসিক চেয়ারম্যান বলেছেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেই উত্তরাঞ্চলে একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পনগরী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) ‘বগুড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে বাস্তবায়নের কথা ছিল এবং এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।  কিন্তু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে বিশাল ফাঁক রয়ে গেছে, সেটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।বগুড়ার কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে আলু, মরিচ, ভুট্টা ও শাকসবজি, যা নেপাল, ভারতসহ অনেক দেশে রপ্তানি হয়। শুধু তাই নয়, শেরপুর ও কাহালু উপজেলার গ্রামীণ নারীদের তৈরি নানা ধরনের হস্তশিল্প পণ্য জার্মানি, সুইডেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড, ইতালি, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের ১৮টি দেশে রপ্তানি হয় এবং বিশেষ ধরনের পোশাক সৌদি আরব, কাতার, দুবাইসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি বাণিজ্যের চিত্র দেখায় যে বগুড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই উপস্থিতি তার প্রকৃত সম্ভাবনার তুলনায় নগণ্য।একটি আধুনিক শিল্পপার্ক কেবল কলকারখানার সমষ্টি নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম,যেখানে থাকবে কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার, পরীক্ষাগার, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধন প্ল্যান্ট, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা, ডিজিটাল সংযোগ এবং কর্মীদের আবাসিক সুবিধা। বগুড়ায় এখন কৃষি যন্ত্রাংশের ৫০০টি ওয়ার্কশপ, হালকা প্রকৌশল পণ্য তৈরির ৫০০টি কারখানা এবং ফাউন্ড্রি শিল্পের ১২৪টি কারখানা রয়েছে। এই বিক্ষিপ্ত কারখানাগুলো একটি সংগঠিত শিল্পপার্কে একত্রিত হলে উৎপাদন দক্ষতা বহুগুণে বাড়বে, সম্মিলিত বিপণনের সুযোগ তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জন সহজ হবে।হালকা প্রকৌশল শিল্পের রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ক্ষেত্রে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় খাত এবং এই খাতকে রপ্তানিমুখী করা সম্ভব হলে দেশে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বগুড়ায় এই খাতের যে ভিত্তি ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে, তার ওপর একটি আধুনিক শিল্পপার্ক নির্মিত হলে বগুড়া হতে পারে বাংলাদেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং রপ্তানির রাজধানী। জাতীয় পরিসংখ্যানের দিক থেকেও বগুড়ায় বিনিয়োগের যুক্তি অকাট্য। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের মোট বিদেশি বিনিয়োগের ২৯ শতাংশ এবং মোট রপ্তানি আয়ের ১৬ শতাংশ এসেছে শিল্প অঞ্চলগুলো থেকে। কিন্তু বর্তমানে দেশের আটটি ইপিজেড মূলত চট্টগ্রাম, ঢাকা, মোংলা, কুমিল্লা, উত্তরা, ঈশ্বরদী, কর্ণফুলী ও আদমজীতে কেন্দ্রীভূত। এই তালিকায় উত্তরবঙ্গ কার্যত অনুপস্থিত। দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের আবাসস্থল এই অঞ্চলে বিনিয়োগের এই অসামঞ্জস্য বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে খন্ডিত ও অসম করে রাখছে। মানবসম্পদের দিক থেকে বগুড়া সত্যিকার অর্থেই প্রস্তুত। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী বগুড়া সিটির সাক্ষরতার হার ৮৭.৮৭ শতাংশ এবং জনসংখ্যার ১৫.৩৪ শতাংশ ১০ বছরের নিচের শিশু, যা তরুণ ও বর্ধনশীল জনগোষ্ঠীর ইঙ্গিত দেয়। পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি, সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ বের হচ্ছেন। তারা কাজের সন্ধানে ঢাকা বা বিদেশমুখী হচ্ছেন। শিল্পপার্ক হলে এই মেধাবী জনশক্তি নিজের ভূমিতেই কর্মসংস্থান পাবেন, পরিবারের সাথে থাকবেন, এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবেন। পরিবেশগত প্রশ্নটিকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, তবে ঠিকমতো পরিচালনা করলে এটি সমস্যা নয়। বরং পরিকল্পিত শিল্পপার্কে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা, সবুজ প্রযুক্তি এবং সৌরশক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অপরিকল্পিত কারখানার তুলনায় পরিবেশ অনেক কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। করতোয়া নদী ও আশপাশের জলাশয় সংরক্ষণে এটি বরং সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। গত সরকারের আমলে ঘোষিত কিন্তু অবাস্তবায়িত বগুড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পটি পুনর্জীবিত করে দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বেজার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ ইতিমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি বিসিকের প্রস্তাবিত ৩০০ একরের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পনগরী এবং বেজার অর্থনৈতিক অঞ্চলকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা হলে বগুড়া পাবে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পনগরীর মর্যাদা। বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য আকর্ষণীয় করসুবিধা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স, স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা ও সুশীল সমাজকে এই প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই অংশীদার করতে হবে। দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বিশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বগুড়ার মানুষ গত পাঁচ দশক ধরে নিজস্ব উদ্যমে, অল্প পুঁজিতে, কামারশালার হাতুড়ি থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানির স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এই উদ্যমী মানুষগুলোকে কেবল একটি সুষ্ঠু, আধুনিক ও সংগঠিত পরিবেশ দিতে হবে। একটি আধুনিক শিল্পপার্ক সেই পরিবেশই দেবে। বগুড়ার মাটি, মানুষ ও মেধা সবকিছু প্রস্তুত। এখন শুধু দরকার সিদ্ধান্তের সাহস আর বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি।

লেখক :

মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান

কো-ফাউন্ডার ও ক্লাব সেক্রেটারি 
বগুড়া প্রফেশনালস্ ক্লাব।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173205