বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি

বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি

চলতি গরমকালে তাপপ্রবাহের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঝড়ের তান্ডব আর সেই সাথে বাড়ছে বজ্রপাতের ঝুঁকি। খবরে প্রকাশ-গত এপ্রিল মাসে বজ্রপাতে অন্তত ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েক ডজন। সংবাদ পত্রগুলো আরো জানাচ্ছে-সম্প্রতি নড়াইলের লোহাগড়ায় বজ্রপাতে ২ জন কৃষক, একই উপজেলার নওয়াপাড়া গ্রামের জনৈক বাবুল মোল্লা বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আব্দুল হাকিম নামের এক যুবক, যশোরের সদর উপজেলায় এক কিশোর একইভাবে বজ্রপাতে প্রাণ হারায়। পত্রপত্রিকার পাতায় বজ্রপাতে এভাবে মৃত্যুর খবর  এখন অনেকটা নিত্যদিনের ঘটনা।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন-জলবায়ু পরিবর্তন,তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বায়ুদূষণের যৌথ প্রভাবে বাংলাদেশ এখন বজ্রপাতের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটোমোস্ফোরিক অ্যাডমিনিসেট্রশন(নোয়া)এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে-২০২৬ সালে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা  বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কখনো তীব্র গরম, আবার কখনো বজ্রঝড় দেখা দিতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত দেশের অন্যতম প্রাণঘাতী জলবায়ুগত দুর্যোগে পরিণত হলেও সেই অনুযায়ী কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ এখনো খুবই সীমিত। বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটার কারণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন অধ্যাপক জানিয়েছেন-বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ এর ভৌগলিক অবস্থান। বঙ্গোপসাগরের পরেই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর্দ্র বাতাস বাংলাদেশের উপরে ভেসে আসছে। অন্যদিকে উত্তর থেকে ধেয়ে আসছে হিমালয়ের ঠান্ডা বাতাস। এই দুই ধরনের বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের অনুকূল হওয়ায় বাংলাদেশে ব্যাপক বজ্রপাত ঘটছে। আরেকটি গবেষণা বলছে-বাংলাদেশে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে শুরু করে শীতের আগ পর্যন্ত তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় প্রচুর জলীয় বাষ্প ঊর্ধ্বমুখী হয়ে মেঘের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার কারণে মেঘে থাকা জলকণা ও বরফকণার সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে বজ্রপাতের সৃষ্টি হচ্ছে। 

তবে যেভাবেই বজ্রপাত হোক না কেন, তাতে যে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে সেটিই এখন ভয়াবহ বাস্তবতা। বিশেষ করে লক্ষণীয়-বজ্রপাতে পুরুষের মৃত্যুর হার বেশি। কারণ জীবিকার প্রয়োজনে মাঠে প্রান্তরে, রাস্তাঘাটে পুরুষের অবস্থান বেশি হওয়ায় বজ্রপাতের শিকার হচ্ছেন তারাই বেশি। তাতে সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটির অকালে প্রাণ হারানোতে পরিবারটিকে পড়তে হচ্ছে ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে। জাতিসংঘ বলছে-বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যায়। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে প্রতি বছর গড়ে মারা যায় ২০ জনেরও কম। বাংলাদেশে গাছপালা, বিশেষ করে খোলা মাঠে উঁচু গাছ ধ্বংস করে ফেলা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় এবং অসচেতনতার কারণে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন অব্যাহত থাকায় বজ্রপাতে মৃত্যুর হার আগামীতে আরো বাড়ার আশংকাই বেশি। এ থেকে প্রতিকার পাওয়ার উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞগণ বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে আশ্রয় নেয়ার পরিবর্তে বাড়িঘরে বা পাকা স্থাপনার নিচে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁরা সরকারকে হাওড় ও খোলা জায়গায় বজ্রনিরোধক লাইটেনিং অ্যারেস্টার লাগাতে বলেছেন। সরকার এ উদ্যোগটি দ্রুত গ্রহণ করতে পারেন। আবহাওয়া অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও পাবনা জেলাকে শীর্ষ বজ্রপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে এসব জেলায় বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা পাঠাতে বজ্রপাত শনাক্তকরণ সেন্টার স্থাপন করেছে, যাতে নির্দিষ্ট এলাকায় উপস্থিত লোকজনকে বজ্রপাতের বার্তা পাঠানো যায়। তবে বজ্রপ্রবণ এলাকা শুধু  সিলেট ও ঢাকা বিভাগেই নেই, এখন সারাদেশেই কম-বেশি বজ্রপাত হয়। সেজন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সারাদেশেই। তবে শুধু সতর্ক বার্তা শোনানোই যথেষ্ট নয় বরং এ সময়ে কী করতে হবে তা জানাও প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন-বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পন্থা হলো-৩০ থেকে ৩০ একটি নিয়ম। বজ্রপাতের আলো দেখামাত্র সেকেন্ড গণনা শুরু করতে হবে। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বজ্রধ্বনি শোনা গেলে বুঝতে হবে বজ্রপাত একদম কাছে। এবং বিপদ বয়ে আনছে। তখনই ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে। ঘরে ঢোকার পর শেষ বজ্রধ্বনি শোনার অন্তত ৩০ মিনিট পর বাইরে যাওয়া উচিত। এ নিয়মটি কঠোরভাবে মেনে চলা হলে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব। সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম সম্প্রতি কৃষকদের বজ্রপাত সম্পর্কিত মৃত্যুঝুঁকি কমাতে খোলা আকাশের নিচে কাজ করার সময় কালো মেঘ দেখলেই নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া, কোন অবস্থাতেই বৃষ্টির সময় গাছের নিচে আশ্রয় না নেয়া ও অবশ্যই পায়ে জুতা ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত-তালগাছ হচ্ছে প্রকৃতির বজ্রনিরোধক। সেজন্য বিশেষ করে রাস্তার দুই পাশে তাল গাছ লাগাতে হবে বেশি বেশি করে। তালগাছের চারা বড় হতে ১৪-১৫ বছর সময় নেয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী হলেও সবচেয়ে বেশি কার্যকর। তাই এখনই সমস্ত রাস্তায় তালগাছ রোপণের ব্যবস্থা করতে হবে,যা থেকে সুরক্ষা পাবে বর্তমান ও আগামীর প্রজন্ম। পাশাপাশি বজ্রনিরোধক লাইটপোষ্টে সিমেন্ট ব্যবহার করে প্রলেপ দিতে হবে,যেটি নেপালেও করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে সাশ্রয়ী হলো প্রচুর গাছ লাগানো। কারণ গাছ শুধু জলবায়ু পরিবর্তন রোধেই ভূমিকা রাখে না,এটি কার্যকর বজ্রপ্রতিরোধকও। সুতরাং চলতি মৌসুমে প্রচুর গাছ লাগিয়ে শুধু তাপমাত্রা কমানোই নয়, বজ্রপাতের মতো আকষ্মিকভাবে নেমে আসা মৃত্যুদানবকে অনেকটা রুখে দেয়া যেতে পারে। 


লেখকঃ

রাহমান ওয়াহিদ

কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/173010