ইরান যুদ্ধ শেষ, কী পেলেন ট্রাম্প?

ইরান যুদ্ধ শেষ, কী পেলেন ট্রাম্প?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানজুড়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরু করার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বেশ কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। এর মধ্যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস থেকে শুরু করে তেহরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেসবও ছিল।

এর তিন মাসেরও বেশি সময় পর একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে উভয়পক্ষ। ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ট্রাম্প আসলে কী কিছু অর্জন করতে পারলেন? তার নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর কিছু কী পূরণ হলো, সেই বিষয়ে এই প্রতিবেদন।

• ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন
যুদ্ধ শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কাছেই সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার ছিল। দেশটির কাছে বিভিন্ন ধরনের ২ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ২ হাজার কিলোমিটার (১ হাজার ২৪০ মাইল) পর্যন্ত পাল্লা নিয়ে ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম এবং বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেড ছিল; যা প্রতিরোধ করা কঠিন।

ভালো আচরণ না করলে আবারও ইরানে বোমা ফেলা হবে

ইরান দূরপাল্লার ড্রোনেরও অন্যতম প্রধান উৎপাদক; বিশেষ করে একমুখী আত্মঘাতী শাহেদ ড্রোন, যা তেহরানের পাশাপাশি রাশিয়াও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পর মার্কিন একাধিক সূত্র ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিল, ইরানের অস্ত্রাগারের এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অন্য এক-তৃতীয়াংশ সম্ভবত ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস কিংবা মাটির নিচে চাপা পড়েছে।
 
গত ১৪ মে কংগ্রেসে মার্কিন অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার ড্রোন তৈরি ও মজুত করার সক্ষমতা বহু বছর পিছিয়ে গেছে। তিনি বলেন, এই সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দেড় হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৬ হাজারের বেশি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

ইরানের কাছে এখন কতসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে তা স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন মিত্রদের কাছে আঘাত হানার সক্ষমতা দেশটির এখনও রয়েছে। এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক প্রমাণ মেলে গত ৬ জুন। ওই দিন কুয়েত ও বাহরাইনে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল তেহরান। একইভাবে পরের দিন অর্থাৎ ৭ জুন ও ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরানের সামরিক বাহিনী। তবে ইরানের সর্বশেষ এসব হামলায় বড় ধরনের কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে দেশগুলো জানিয়েছে।

• প্রচলিত সামরিক বাহিনী
মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা ওই অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শন কিংবা মার্কিন বিভিন্ন অভিযানকে হুমকিতে ফেলার মতো ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে।

কুপার কংগ্রেসে বলেছেন, ইরানের ১৬১টি নৌজাহাজ ধ্বংস ও দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ৮২ শতাংশ অকেজো করে দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের বিমান বাহিনী যেখানে প্রতিদিন ১০০টি পর্যন্ত যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করতো, সেখানে এখন তারা কোনও মিশনেই অংশ নিচ্ছে না।

তা সত্ত্বেও দ্রুতগতির নৌকা, মাইন, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজের সাহায্যে যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছে ইরান। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়েই বাণিজ্যিক জাহাজে করে পরিবাহিত হয়; যা ইরান আটকে দেয়।

• পারমাণবিক কর্মসূচি
ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখাই তার প্রধান লক্ষ্য। তেহরান অবশ্য শুরু থেকেই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনও উদ্দেশ্য নেই এবং এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।

কিন্তু এই যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতায় বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন আনতে পারেনি। গত মাসে মার্কিন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণে বলা হয়, একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে ইরানের এক বছরেরও কম সময় লাগবে; যা ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পর দেওয়া সময়সীমার মতোই রয়ে গেছে।

আগামী শুক্রবার রূপরেখা চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সমঝোতাকারীদের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, এটি কোনোভাবেই বিদেশে পাঠানো হবে না।

• ইরানি প্রক্সি 
গত ২ মার্চ হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরাক, লেবানন, গাজা ও ইয়েমেনে সক্রিয় সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কাছে আর অস্ত্র ও অর্থায়ন করতে দেওয়া যাবে না ইরানকে; যাদের ওপর ভর করে তেহরান কয়েক দশক ধরে শক্তি প্রদর্শন এবং শত্রুদের হয়রানি করে আসছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এসব গোষ্ঠীকে সহায়তা বন্ধ করার ইরানি কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং স্বতন্ত্র বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক আগের চেয়ে অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এর বড় একটি অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে যুদ্ধ শুরুর আগেই। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামলার পর গাজায় হামাসের অনেক শীর্ষ নেতা এবং হাজার হাজার যোদ্ধাকে হত্যা করে ইসরায়েল। পাশাপাশি লেবাননে হিজবুল্লাহ মিলিশিয়াদেরও অনেক নেতাকে হত্যা করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। এ ছাড়া ২০২৪ সালে সিরিয়ায় সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনের পতনে হিজবুল্লাহকে পুনরায় অস্ত্র সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ হারায় ইরান।

নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের অর্থনৈতিক সংকটও এসব গোষ্ঠীকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে দেশটির সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। চলতি যুদ্ধে এই গোষ্ঠীগুলো খুব বড় কোনও ভূমিকা পালন করতে পারেনি। গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলে নতুন করে কোনও হামলা চালায়নি হামাস। অন্যদিকে হুথিরাও ইয়েমেন থেকে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলে বড় কোনও ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি।

গত ২ মার্চ ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে এই যুদ্ধে যোগ দেয় হিজবুল্লাহ। এর জবাবে ইসরায়েল বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে; যার ফলে লেবাননে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মানুষ নিহত এবং ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৮ জন ইসরায়েলি সেনা এবং চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
 
মার্কিন কংগ্রেসে কুপার বলেছিলেন, ইরান এখন আর এসব গোষ্ঠীকে উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করার সক্ষমতা রাখে না। যদিও তিনি এই মন্তব্যের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও ব্যাখ্যা দেননি।

• শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন

যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী উৎখাতে বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর দিনই বিক্ষোভকারীদের সরকার দখলের একমাত্র সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল। গত ৬ মার্চ তিনি বলেছিলেন, ইরানের শর্তহীন আত্মসমর্পণ এবং একজন নতুন ও গ্রহণযোগ্য নেতা পাওয়ার মাধ্যমেই কেবল এই যুদ্ধ শেষ হবে।

যদিও এই যুদ্ধ ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবুও ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি তার লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন। কারণ আলি খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তার ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। গত ২৯ মার্চ ট্রাম্প নতুন এই নেতাকে ইরানের ‘‘নতুন এবং অধিক যৌক্তিক শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করেন।

গত কয়েক সপ্তাহে দেখা গেছে, ইরানের নেতাদের উৎখাত করার জন্য আগের মতো আহ্বান জানানো থেকে বিরত রয়েছেন ট্রাম্প।

সূত্র: রয়টার্স।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/172929