বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেল প্রকল্প: টেকসই প্রকৌশল ভাবনা

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেল প্রকল্প: টেকসই প্রকৌশল ভাবনা

উত্তরবঙ্গের অবহেলিত রেল যোগাযোগের ইতিহাসে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েল গেজ রেলপথ এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বপ্নের নাম। সম্প্রতি এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব মীর শাহে আলমের ঐকান্তিক উদ্যোগ এবং জননেতা জনাব তারেক রহমানের দূরদর্শী দিকনির্দেশনা এই অঞ্চলে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। প্রস্তাবিত প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথটি নির্মিত হলে ট্রেনকে সান্তাহার ও ঈশ্বরদী হয়ে ঘুরে যাওয়ার বর্তমান ১২০ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথটি আর পাড়ি দিতে হবে না। ফলে ঢাকার সাথে রেলের দূরত্ব কমবে ১১০ কিলোমিটারেরও বেশি এবং যাতায়াতের মূল্যবান সময় সাশ্রয় হবে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। উত্তরবঙ্গের কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা প্রসারে এই প্রকল্প যে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে একজন পুরপ্রকৌশলী হিসেবে আমি মনে করি, এই মেগা প্রকল্পের সাফল্য কেবল অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল নয়, এর জন্য প্রয়োজন নিখুঁত কারিগরি পরিকল্পনা এবং দূরদর্শী প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত। 

আমাদের দেশের সাম্প্রতিক মেগা প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। সঠিক ও নিরপেক্ষ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অভাব, দুর্নীতি এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক বড় বড় প্রকল্প আজ দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরণের বোঝা বা "বিষফোড়া" হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি টাস্কফোর্সের সাম্প্রতিক শ্বেতপত্রে দেখা গেছে, পদ্মা সেতু, যমুনা রেলসেতু, কর্ণফুলী টানেল কিংবা বিআরটি লাইন-৩ এর মতো ৮টি প্রধান মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা থেকে এক লাফে ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে। প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার এই অতিরিক্ত ব্যয় ও ঋণের বোঝা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, অপরিকল্পিত বাস্তবায়ন দেশের জন্য কতটা মারাত্মক হতে পারে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথকে এই ধরণের কারিগরি ও আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হলে শুরুতেই একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (Feasibility Study) পরিচালনা করা আবশ্যক, যা প্রকল্পকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং বাস্তবসম্মত ভিত্তি প্রদান করবে। রেলপথের নির্মাণশৈলী কেবল কিছু লোহার পাতের মেলবন্ধন নয়। প্রকৌশলগত দৃষ্টিতে এটি একটি সুসমন্বিত নিখুঁত কাঠামো, যা ইস্পাতের তৈরি মূল রেললাইন, ট্র্যাক গেজ বজায় রাখার কংক্রিট স্লিপার, কম্পন ও চাকার ভার সুষমভাবে বণ্টনকারী কৌণিক পাথরের ব্যালাস্ট, প্যানড্রোল ক্লিপের মতো মজবুত বন্ধনী এবং সবার নিচে থাকা প্রাকৃতিক বা প্রস্তুতকৃত মাটির সুদৃঢ় সাবগ্রেডের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। উত্তরবঙ্গের এই নতুন রুটে মাটির ভারবহন ক্ষমতা এবং বসে যাওয়ার (Settlement) ঝুঁকি নিরূপণে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভূ-প্রযুক্তিগত (Geotechnical) সমীক্ষা চালাতে হবে। বিশেষ করে নরম ও দুর্বল মাটির স্তরে আধুনিক ‘গ্রাউন্ড ইমপ্রুভমেন্ট’ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে ট্রেনের গতি ও লাইনের স্থায়িত্ব দুটোই হুমকির মুখে পড়তে পারে। এর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের ভৌগোলিক বন্যাপ্রবণতা মাথায় রেখে রেলপথের উচ্চতা বা ফরমেশন লেভেল সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। নকশা এমন হওয়া চাই যেন রেলপথ কোনোভাবেই আঞ্চলিক প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি না করে বা দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। নদী ও জলাশয়ের ওপর নির্মিতব্য সেতু ও কালভার্টগুলোর নকশায় ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবৃষ্টির চরম ঝুঁকিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, এবং তলদেশের মাটি ক্ষয় ঠেকাতে সুনিশ্চিত করতে হবে আধুনিক স্কাওয়ার প্রটেকশন ব্যবস্থা। একই সাথে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন (ESIA) করে এই অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি।

এই প্রকল্পের অন্যতম একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বগুড়া শহরের অভ্যন্তরীণ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। বর্তমানে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের বুক চিরে যাওয়া লাইনের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার ঘণ্টা যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে থাকে, যা তীব্র যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগের কারণ। এই বাস্তবতায় কিছুদিন পূর্বে শহরকে এড়িয়ে রানীরহাট-গাবতলী অংশ দিয়ে একটি বিকল্প নতুন রুটের যে প্রস্তাব এসেছে, তা কারিগরি দিক থেকে অত্যন্ত যৌক্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদে শহরকে যানজটমুক্ত রাখার জন্য কার্যকর ছিল। তবে এই রুট পরিবর্তনের জন্য যে প্রায় ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে, সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, কৃষিজমি এবং স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঠিক ও মানবিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব পড়বে এটা চিন্তার বিষয়। আবার সর্বশেষ ভাষ্য অনুযায়ী শহরের ভিতর দিয়ে উড়াল সেতুর মাধ্যমে ট্রেন চলাচল ব্যবস্থাকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেক্ষেত্রে অবকাঠামোর বৃহৎ পরিসরে খরচ সংক্রান্ত চিন্তা থাকবে। 

একটি টেকসই মেগা প্রকল্পের মূল চাবিকাঠি হলো এর সামগ্রিক জীবনচক্র ব্যয় মূল্যায়ন (Life Cycle Cost Analysis)। শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক নির্মাণ ব্যয়ের দিকে না তাকিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার অর্থনৈতিক উপযোগিতা যাচাই করতে হবে। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাবতলী ও শেরপুর অঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত ঢাকায় পৌঁছানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভারত, নেপাল ও ভুটানমুখী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডোর হিসেবে এই রেলপথের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তাই স্টেশন ও সেতুগুলোর নকশা এমনভাবে করা উচিত যেন ভবিষ্যতে ট্রেন বৃদ্ধি কিংবা বৈদ্যুতিক রেল (Electrification) ও উচ্চগতির ট্রেনের চাহিদা অনুযায়ী একে সহজেই সম্প্রসারণ করা যায়। লেভেল ক্রসিংয়ের পরিবর্তে জনবহুল মোড়গুলোতে পর্যাপ্ত ওভারপাস বা আন্ডারপাস এবং আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা যুক্ত করে একে একটি ‘স্মার্ট রেলওয়ে’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবেই বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক মুক্তির এক অবিনাশী লাইফলাইন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

লেখক:

প্রকৌশলী লিটন চন্দ্র দাস

সদস্য, ইস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়াস, বাংলাদেশ (IEB)
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,
পুন্ড্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/172567