সানোয়ারের প্রাণ গেল আইভরি কোস্টে, ২৩ দিনেও দেশে ফেরেনি মরদেহ
রংপুর জেলা প্রতিনিধি: আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আইভরি কোস্ট থেকে ফোনের ওপাশে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই পরিবারের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন সানোয়ার হোসেন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরাবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, চাকরির প্রলোভনে আইভরি কোস্টে নিয়ে গিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। একই ঘটনায় প্রাণে বেঁচে দেশে ফিরেছেন আরেক ভুক্তভোগী জব্বার মিয়া।
ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, পীরগাছা উপজেলার পশুয়া টাঙ্গাইলপাড়া এলাকার আব্দুর রহমান মিয়া দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আইভরি কোস্টে লোক পাঠানোর কথা বলে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তাদের দেয়া আশ্বাসে কাউনিয়া উপজেলার গোড়াই গ্রামের জব্বার মিয়া এবং পীরগাছা উপজেলার পশুয়া খাঁপাড়া গ্রামের সানোয়ার হোসেন বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। জনপ্রতি ৭ লাখ টাকা চুক্তিতে ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আসামিদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রহমান ট্রেডার্সে মোট ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
সানোয়ার প্রায় ১০ বছর ধরে ভ্যান চালিয়ে এবং ছোট পরিসরে ভাঙারির ব্যবসা করে সংসার চালাতেন। পরিবারে স্ত্রী, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে জুনাইদ(১২) ও বিবাহিত মেয়ে আফরিন(১৮) রয়েছেন। স্বজনদের দাবি, পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশ থেকে রওনা হয়ে পরদিন আইভরি কোস্টে পৌঁছান সানোয়ার ও জব্বার। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীদের কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। বরং শুরু হয় জিম্মি করে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া।
সানোয়ারের স্ত্রী হাজেরা বেগম জানান, নিরুপায় হয়ে সানোয়ারের বড় ভাই মনু মিয়া এবং পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন বিকাশ নম্বর ও ব্যাংক হিসাবে আরও ৮ লাখ টাকা পাঠান। পরিবারের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করা হলে গত ১৬ এপ্রিল মূল অভিযুক্ত আব্দুর রহমান মিয়া নন-জুডিশিয়াল ¯ট্যাম্পে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদন করলেও কাজের কাজও কিছু হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একপর্যায়ে গত ২২ মে আইভরি কোস্টে মারা যান সানোয়ার হোসেন। একই ঘটনায় জব্বার মিয়া গত ৫ জুন দেশে ফিরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন।
এদিকে, সানোয়ারের মৃত্যুর প্রায় ২৩ দিন পার হলেও এখনও মরদেহ দেশে ফেরেনি। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। দূতাবাসের সাথেও কার্যকর যোগাযোগ করতে পারেননি তারা। স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী হাজেরা বেগম বলেন, আমার স্বামী ভালো থাকার আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন শুধু আমার স্বামীর লাশটা দেশে ফেরত চাই। যারা আমার স্বামীর সর্বনাশ করেছে, তাদের বিচার চাই।
এ বিষয়ে জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অধিদপ্তরে অভিযোগ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগের বিষয়ে আব্দুর রহমান মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইলে ফোন করা হলে তার স্ত্রী কল রিসিভ করেন এবং সাংবাদিক পরিচয় জানার পর ফোন কেটে দেন। রংপুরের পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম খন্দকার মহিব্বুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীদের সংযুক্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/172385