কুশিকাটায় সিনথিয়া জিমের নতুন দিগন্ত

কুশিকাটায় সিনথিয়া জিমের নতুন দিগন্ত

নিজের আলোয় ডেস্ক: ড্রয়িংরুমের সোফার কুশন কভার, টেলিভিশনের ঢাকনা কিংবা শীতের চিরাচরিত গলাবন্ধনী বাঙালির ড্রয়িংরুমে দশকের পর দশক ধরে কুশিকাটা বা ক্রোশেটের পরিচয় ছিল ঠিক এই গণ্ডিতেই। অথচ বৈশ্বিক ফ্যাশন দুনিয়ায় এর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বখ্যাত পপতারকা সেলেনা গোমেজ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক র?্যাম্প মডেলদের গায়ে এখন প্রায়ই শোভা পায় কুশিকাটার তৈরি আধুনিক টপস কিংবা গাউন। পাশ্চাত্যের এই আধুনিক ফ্যাশন ট্রেন্ড দেখেই নতুন এক স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন বাংলাদেশের তরুণী সিনথিয়া জিম।

কুশিকাটার কাজকে সেই চেনা ছক থেকে বের করে একদম আধুনিক রূপ দেওয়ার অদম্য ইচ্ছা থেকেই তিনি গড়ে তোলেন তার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘তন্তুর সাতকাহন’। এই সফলতার গল্পটা শুরু হয়েছিল সিনথিয়া জিমের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে। পুঁজি বলতে ছিল কেবলই টিউশনি করে জমানো সামান্য কিছু টাকা। সেই সঞ্চয় পকেটে নিয়ে তিনি ছোটেন মিরপুর-১০ নম্বরের সুতার বাজারে। সেখান থেকে কিনে আনেন প্রাথমিক কিছু সুতা আর বুননের হুক। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তাঁর প্রধান শিক্ষক ছিল ইউটিউব। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে একা একাই আয়ত্ত করেন বুননের নান্দনিক সব কৌশল। শুরুতে নিজের জমানো টাকার সঙ্গে স্বামীর দেওয়া কিছু অর্থ যোগ করে মাত্র ছয় হাজার টাকা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘তন্তুর সাতকাহন’। সেই সামান্য পুঁজি আজ লভ্যাংশের ওপর ভর করে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকার চলতি পুঁজিতে।

সময়ের সঙ্গে ক্রেতাদের রুচির পরিবর্তন জিম খুব ভালোভাবেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই শুধু ইউটিউবের ওপর নির্ভর না থেকে, একটি নারী উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের ওপর প্রথাগত কোর্স সম্পন্ন করেন। সেই অর্জিত জ্ঞান তিনি কাজে লাগান নিজের বুনন শিল্পে। ফলে তার হাত ধরে বদলে যায় পণ্যের তালিকাও। সনাতন বিছানার চাদরের বদলে ‘তন্তুর সাতকাহন’-এ এখন মিলছে কোরিয়ান ট্রেন্ডি হেয়ার ক্লিপ, স্ট্রবেরি ক্লিপ, ফ্লোরাল বুকে (ফুলের তোড়া), থ্রিডি পুতুল বা অ্যামিগুরুমি, ব্যাগ ও ফোন চার্মস, স্কার্ট এবং ওয়েস্টার্ন বিকিনি টপসের মতো হাল ফ্যাশনের সব সামগ্রী। বর্তমানে রাজধানী ছেড়ে আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে পরিচালিত হচ্ছে এই উদ্যোগের যাবতীয় কার্যক্রম। মফস্বল শহরের মানুষের হস্তশিল্পের প্রতি আগ্রহ থাকলেও চড়া দামের কারণে অনেকেই তা কিনতে পারেন না। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে জিম পণ্যের দাম রেখেছেন একদম হাতের নাগালে।

তার সংগ্রহে মাত্র ২০ টাকার কি-রিং যেমন রয়েছে, তেমনি আছে কয়েক হাজার টাকার এক্সক্লুসিভ ফ্যাশন পণ্য। ফলে অনলাইনে প্রতি মাসে ৮-১০টি বড় কাস্টমাইজড অর্ডার পাওয়ার পাশাপাশি অফলাইনের স্থানীয় শোরুম এবং মেলাগুলোতেও তার পণ্যের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিয়ের পর নারীদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা ক্যারিয়ার গড়াটা বেশ কঠিন। তবে জিমের ক্ষেত্রে পরিবারই হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে বড় শক্তি। জিমের স্বামী কেবল আর্থিক সহযোগিতাই করেন না, বরং পণ্যের মান যাচাই ও নতুন আইডিয়া দিয়ে পাশে থাকেন।

বাবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ের এই হাতের কাজের প্রচার করেন পরম গর্বে। আর শাশুড়ি ঘরের কাজের চাপ সামলে জিমকে কাজের ফুরসত করে দেন, আত্মীয়দের কাছে প্রশংসা করেন পুত্রবধূর প্রতিভার। পরিবারের এমন ইতিবাচক পরিবেশ নিয়ে জিম বলেন, “পরিবারের সমর্থন থাকলে একজন নারীর পক্ষে যেকোনো বাধা জয় করা সম্ভব। আমাকে দেখে এখন আমার আশপাশের অনেক গৃহিণীও নতুন কিছু করার সাহস পাচ্ছেন। ”ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি কুশিকাটার একটি মানসিক দিকও খুঁজে পেয়েছেন জিম। বুননের এই সূক্ষ্ম মনোযোগকে তিনি মনে করেন এক ধরনের ‘সেলফ-হিলিং থেরাপি’, যা প্রতিদিনের মানসিক চাপ ও ক্লান্তি দূর করতে দারুণ কার্যকরী। ব্যবসার প্রসারে চড়া সুদের ব্যাংক ঋণের পেছনে না ছুটে, নিজের উপার্জিত মুনাফা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার নীতিতেই তিনি বিশ্বাসী। ‘তন্তুর সাতকাহন’কে নিয়ে সিনথিয়া জিমের স্বপ্ন অবশ্য আকাশছোঁয়া। ভবিষ্যতে তিনি বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘ক্রোশেট ক্যাফে’ গড়ে তুলতে চান। যেখানে দেশি-বিদেশি সুতার এক বিশাল রাজ্য থাকবে, আর ভোজনরসিকেরা কফির কাপে চুমুক দেওয়ার পাশাপাশি নিজেরা বসে কুশিকাটার কাজ করতে পারবেন এবং এই শিল্পকে নতুন করে শিখতে পারবেন।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/172323